২৭শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১২ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৬ই জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

‘তোমাকেই নিতে হবে আগামী পৃথিবীর ভার’

‘পড়ো, পড়ো আরো পড়ো’

আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: মাওলানা যাইনুল আবেদীন এর আত্মজৈবনিক সাক্ষাৎকার ‘হরফে আঁকা জীবন’ বইটি পড়ছি। খ্যতিমান লেখক কলামিষ্ট আমিন ইকবাল এর সাক্ষাৎকার ও গ্রন্থনা। বড় চমৎকার সাক্ষাৎকার। বিশেষ করে আমিন ইকবাল যেভাবে যাইনুল আবেদীন সাহেবকে হাড়ে-নাড়ে প্রশ্ন করেছেন, তাতে তাঁর কোনকিছু বাদ রাখেননি।

সাক্ষাৎকার গ্রন্থের এক পর্বে যাইনুল আবেদীন সাহেব সেই ছাত্রদের তরবিয়তী সংগঠন ‘লাজনাতুত তলাবা; এর কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, লাজনাতুত তলাবার স্লোগান ছিল ‘তোমাকেই নিতে হবে আগামী পৃথিবীর ভার’। লাজনার কর্মসুচি ছিল ;পড়ো, পড়ো আরো পড়ো’। সেই স্লোগান দিয়েই ছাত্রদের সামনে বই তুলে দেওয়া হয়েছে। ছাত্ররা তখন পড়েছে। দরসিয়্যাতের কিতাবের পাশাপাশি গায়ের দরসি কিতাব তথা বাইরের বই প্রচুর পরিমাণ পড়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো সেই পড়াপড়ি আর নেই।

‘যখন থেকে কওমী মাদ্রাসায় রাজনীতি ঢুকল–তখন থেকে রাজনীতির এই আমোদপূর্ণ জায়গা থেকে ছাত্রদের পড়ার টেবিলে ধরে রাখা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল।’

কওমী মাদ্রাসায় রাজনীতি ঢোকার পর থেকে পড়ার সেই পরিবেশ নেই। ছাত্ররা এখন বই থেকে দুরে। বই পড়ার স্থানে তারা রাজনীতি ঢুকিয়েছে। এখন বই কিনেও না, পড়েও না। সেই সময়ে ছাত্ররা দরসের কিতাবপড়া শেষ করে বাইরের বই এত্ত পড়েছে, পড়তে পড়তে ফজরের আজান হয়েছে। এভাবে পড়ার মধ্য দিয়েই ছাত্রদের সময় পার হয়েছে।

এখন মাদ্রাসাগুলোতে রাজনীতির ছোবলে এমন ধরাশায়ী। কোন গায়রে দরসি কিতাব পড়ার সময় নেই। এমনকি দরসের কিতাবগুলি হক আদায় করে পড়ার সময় হয় না। যার কারণে যোগ্যতা সম্পন্ন ছাত্রের বড় অভাব। যোগ্য আলেম তৈরী হচ্ছে না।

আমি কিছুদিন আগে একটা আর্টিকেল লিখেছি, যেটার নাম ‘হারিয়ে যাচ্ছে কওমীর ঐতিহ্য’। সেখানে উল্লেখ করেছি, তরবিয়তবিহীন ছাত্র সংগঠনের দাপটে ছাত্রগণ লেখাপড়া থেকে দূরে। লেখাপড়ায় সময় দিতে পারে না। বহু মেধাবী ছাত্র ভোতা হয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষার সময় নোটবই দেখে পড়াশুনা করে পরীক্ষা দেয়। ভালো ফলাফল হলেও তাদের কোন যোগ্যতা পয়দা হয় না।

ঠিক যাইনুল আবেদীন সাহেবের কথার সাথে মিলে গেল। আসলেই কওমী মাদ্রাসাগুলোতে রাজনীতির নগ্ন থাবা লাগার পর থেকেই তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। সেই সোনালী দিন আর নেই। আল্লামা কাজী মুতাসীম বিল্লাহ (রহ.), আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দাবা.), আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী (রহ.) এঁরা ছাত্রদের হাতে বই তুলে দিয়েছেন। তাঁরা স্লোগান দিয়েছেন, ‘তোমাকেই নিতে হবে আগামী পৃথিবীর ভার’। সুতরাং ‘পড়ো, পড়ো আরো পড়ো’। যার কারণে সেসময়ে তৈরী হয়েছে বহু যোগ্য আলেমেদ্বীন।

তিনজন মহান ব্যক্তি আল্লামা কাজী মুতাসীম বিল্লাহ (রহ.), আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দাবা.), আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী (রহ.) তাঁদের বলা হয় ছাত্রগড়ার কারিগর। সত্যি তাঁরা ছাত্র গড়েছেন। ছাত্রদের রাস্তায় নামাননি। মিছিল-মিটিংএ নিয়ে যাননি। তাদের হাতে বই তুলে দিয়েছেন। যেকারণে তারা যেসব ফসল উপহার দিয়েছেন এ জাতিকে, সেটা এখন আর নেই। সেই রকম সম্পদ আর তৈরী হচ্ছে না।

সেই সময়ে সেই স্লোগান আর কর্মসুচির ছাত্র হলো, মাওলানা আবুল ফাতাহ ইয়াহইয়া (রহ.), মাওলানা ইসহাক ফরিদী (রহ.), ড. মাওলানা মুশতাক আহমাদ, মাওলানা আবু সুফিয়ান যাকী (রহ.), মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন, মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম, মাওলানা আবু সাবের আব্দুল্লাহ, মাওলানা আব্দুল গাফফার, মাওলানা যাইনুল আবেদীন প্রমুখ। বর্তমানে এসব ব্যক্তি দেশসেরা লেখক-কলামিষ্ট। কওমী অঙ্গনের উজ্জল নক্ষত্র তাঁরা।

আরও পড়ুন: কওমি মাদরাসা ছুটে চলেছে কোথায়

দেশের অবস্থার আলোকে আবারও সেই স্লোগান আর কর্মসুচি হাতে নেওয়া প্রয়োজন মনে করি।এখনও একজন শীর্ষ মুরুব্বী আছেন। আছে তাঁর হাতেগড়া বহু সন্তান। তাঁদের মাধ্যমে কওমী মাদ্রাসাগুলোকে ঢেলে সাজাতে পারবেন। পড়ো, পড়ো আরো পড়ো, এই কর্মসুচি তারাই বাস্তবায়ন করার সক্ষমতা রাখেন। তাঁরা যে যেখানে আছেন, সেখানেই এই মিশন চালু হতে পারে।নচেৎ আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যত অন্ধকারের দিকে চলে যাচ্ছে।

এমন অবস্থা এখন, প্রায় প্রতিটি কওমী মাদ্রাসাতে কমবেশী ছাত্র সংগঠন রয়েছে। যারা ছাত্রদের সেই পড়ো,পড়ো এর জায়গা বিনষ্ট করে যাচ্ছে। এজন্য সেই সোনালী দিনের কথা স্মরণ করে ছাত্রদের গড়ে তোলা দরকার। পড়ার পরিবেশ আবারও তৈরী করতে হবে। ছাত্রাবাস্থায় পড়ার দিকেই বেশী ঝোক রাখতে হবে। পড়ালেখা ছাড়া ভিন্ন বিষয় না বলতে হবে সবার। আল্লাহ সহজ করে দিন। আমিন।

লেখক: কওমী মাদ্রাসা শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com