২৩শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৫ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

রমজানের সঙ্গে কোরআনের সম্পর্ক নিগূঢ়

মাহতাব উদ্দীন নোমান : কোরআন হলো রমজানের নিগূঢ় তত্ত্ব; রমজানের সঙ্গে কোরআনের সম্পর্কও সুগভীর। রমজান মাস এমন যে, তাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে। আর আল্লাহ তাআলার আদেশে হযরত জিবরাঈল এর মাধ্যমে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট প্রেরিত নির্দেশনাবলীর সংকলনকে কোরআন বলে।

কোরআন বিশ্ব মানবতার মুক্তির সনদ ও মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানবজাতির পথনির্দেশের জন্য প্রেরিত সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। এটি মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। ইসলামী জীবন ব্যবস্থার মূল উৎস। এ কিতাব এবং এই কিতাবে প্রদত্ত বিধি-বিধান চিরন্তন ও সর্বকালীন। এর সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজেই নিয়েছেন। সুতরাং দেশ-কাল-ভাষা-জাতি-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মানুষের জন্য কোরআনের উপর ঈমান আনা এবং এর বিধান মেনে চলা আবশ্যক।

সাহাবায়ে কেরাম প্রায় সারা বছর প্রতি মাসের প্রতি সপ্তাহে পূর্ণ কোরআন শরিফ একবার তিলাওয়াত করতেন। প্রতি সাত দিনে এক খতম পড়তেন বলেই কোরআন মজিদ সাত মঞ্জিলে বিভক্ত হয়েছে। তারা রমজান মাসে আরও বেশি বেশি তিলাওয়াত করতেন।

কোরআন যেমন আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে বান্দার নিকট প্রেরিত একটি জীবন বিধান, ঠিক তেমনি প্রেমাষ্পদের পক্ষ থেকে প্রেমিকের নিকট প্রেরিত চিঠি। একজন প্রেমিক যেমন তার প্রেমাষ্পদের চিঠি বারবার পড়তে চাই, সে চিঠির শব্দগুলোর মধ্যে আলাদা স্বাদ অনুভব করে, ঠিক তেমনি ভাবে আল্লাহ তাআলার প্রেমিকগণ এই কোরআন শরীফ কে বারবার পড়ে, তার আলাদা স্বাদ অনুভব করে।

আমরা মুসলমানরা সূরা ফাতিহা প্রত্যেক নামাজের মধ্যে পড়ি, কিন্তু কোনদিনই সুরা ফাতিহা আমাদের নিকট পুরান হয়না। কেমন যেন যতবার পড়ি ততবারই নতুন স্বাদ নতুন আনন্দ অনুভব হয়। সুমধুর কন্ঠের তেলাওয়াতে হৃদয়ের মধ্যে প্রশান্তি নেমে আসে। নিমিষেই দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা বেদনা হারিয়ে যায়। কেমন যেন আমি স্বয়ং আল্লাহ তা’আলার সামনে দাঁড়িয়ে তেলাওয়াত করছি আর আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমার তেলাওয়াতের উত্তর দিচ্ছেন হাদিসে আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি নামাযকে আমার মধ্যে এবং আমার বান্দার মধ্যে অর্ধেক অর্ধেক ভাগ করে দিয়েছি। আমার বান্দাকে তাই দেওয়া হবে যা সে প্রার্থনা করবে।

অতঃপর যখন বান্দা বলে, সকল প্রশংসা বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে’। যখন বান্দা বলে, যিনি দয়াময় দয়ালু। তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দা আমার গুণ বর্ণনা করেছে’। যখন বান্দা বলে, যিনি প্রতিদান দিবসের মালিক। তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দা আমাকে মহিমান্বিত করেছে’। কখনো কখনো বলেন ‘আমার বান্দা আমাকে ক্ষমতা প্রদান করেছে’।

অতঃপর যখন বান্দা বলে, আমরা আপনার ইবাদত করি এবং আপনার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি। তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এটা আমার এবং আমার বান্দার মধ্যকার বিষয়। আমার বান্দাকে তাই দেওয়া হবে যা সে প্রার্থনা করবে।’ বান্দা যখন বলে, আমাদেরকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেন। ওই ব্যক্তিদের পথে পরিচালিত করেন যাদের উপর আপনি নেয়ামত দান করেছেন। তাদের পথে পরিচালিত করেন না যারা অভিশপ্ত এবং পথভ্রষ্ট। তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এটা আমার বান্দার জন্য এবং আমার বান্দাকে তাই দেওয়া হবে যা সে আবেদন করবে। (মুসলিম, হাদীস নং ৩৯৫)

গুনাহ করতে করতে আমাদের জিব্বা গুলো নষ্ট হয়ে গেছে। তাই আমরা কোরআন শরিফ পড়ার স্বাদ পাই না। আমাদের কান গুলা বধির হয়ে গেছে। তাই আল্লাহ তাআলার উত্তর গুলো শুনতে পারি না। কোরআন শরিফের স্বাদ অনুভব করতে হলে আমাদের মুখের গুনাহ, কানের গুনাহ, চোখের গুনাহ সকল প্রকার গুনাহ থেকে বিরত থাকতে হবে।

কোরআন এমন একটা গ্রন্থ যার তেলাওয়াতে স্বাদ অনুভব হওয়ার পাশাপাশি তার প্রত্যেকটি হরফে হরফে সওয়াব রয়েছে। একেকটা হরফের দশগুণ সওয়াব রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কোরআনের একটি অক্ষর পাঠ করলো তার জন্য এর বিনিময়ে একটি নেকী লাভ হবে। আর এই একটি নেকী দশটি নেকীর সমান। আমি বলছি না যে, আলিফ-লাম-মীম একটি অক্ষর। বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর ও মিম একটি অক্ষর।’ (তিরমিজি হাদিস নং ২৯১০)

আজ আমাদের ঘরগুলো অশান্তিতে ভরপুর। সন্তানরা খারাপ পথে চলে যাচ্ছে, কথা শুনে না। স্ত্রী অনুগত নয়। ঘরে বরকত হচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে আমাদের ঘরে কোরআন তেলাওয়াত নেই। কোরআন এমন একটা বরকতময় গ্রন্থ, যে ঘরে এর তেলাওয়াত হয় ওই ঘরকে আল্লাহ তাআলা বরকতময় করে দেন। ওই ঘরে আল্লাহ তা’আলার রহমত নাযিল হয়। দুষ্ট জিন ও শয়তান থেকে ঘরবাসি সুরক্ষিত থাকে।

হাদীসে বর্ণিত রয়েছে, ‘যখন কোন দল আল্লাহর কোন ঘরে একত্রিত হয়ে কোরআন পাকের তেলাওয়াত করে এবং কোরআন অধ্যায়ন করে, তখন তাদের উপর প্রশান্তি অবতীর্ণ হয়, আল্লাহ তা’আলার রহমত তাদেরকে ঢেকে নেয়, রহমতের ফেরেশতাগণ তাদেরকে বেষ্টন করে নেয় এবং আল্লাহ পাক ফেরেশতাদের মজলিসে তাদের আলোচনা করেন।’ (মুসলিম হাদিস নং ২৬৯৯)

কোরআন তেলাওয়াত কারী যেমন দুনিয়াতেই কোরআনের থেকে উপকার লাভ করে। ঠিক কেয়ামতের দিন এই কোরআনই তার উপকারে আসবে। সে তার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে সুপারিশ করবে। তেলাওয়াতকারীকে ক্ষমা করার জন্য আল্লাহ তা’আলার সাথে জেদ করবে। হাদীসে রয়েছে, ‘তোমরা কোরআনুল কারীম তেলাওয়াত করো। কেননা তা কেয়ামতের দিন তেলাওয়াতকারীর জন্য সুপারিশ করবে।’ (মুসলিম, হাদিস নং ৮০৪)

‘কোরআন শরীফ এমন সুপারিশকারী যার সুপারিশ কবুল করা হবে। এমন বিতর্ককারী যার বিতর্ক মানিয়ে নেওয়া হবে। যে ব্যক্তি কোরআনকে সম্মুখে রাখে তাকে সে জান্নাতের দিকে টেনে নেই আর যে তাকে পিছনে ফেলে দেয় সে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে। (ইবনে হিব্বান হাদিস নং ১২৪)

কোরআনে হাফেজকে কেয়ামতের দিন বলা হবে, ‘হাফেজে কোরআনকে বলা হবে, তুমি পড়ো এবং জান্নাতের স্তর সমূহে আরোহণ করতে থাকো। এবং ধীরে ধীরে স্পষ্টভাবে পড়ো যেমন ধীরে ধীরে স্পষ্ট ভাবে দুনিয়াতে পড়তে। তোমার মর্যাদা সেখানেই হবে, যেখানে তুমি শেষ আয়াতে পৌঁছাবে।’ (আবু দাউদ হাদিস নং ১৪৬৫, তিরমিজি হাদিস নং ২৯১৪)

সুতরাং কোরআন শরীফ শিক্ষা করা এবং দৈনন্দিন তেলাওয়াত করা প্রত্যেকটি মুমিনের জন্য আবশ্যক। যাতে সে দুনিয়াতে এবং আখেরাতে কোরআন দ্বারা উপকার অর্জন করতে পারে। পাশাপাশি সে যেন সমাজের উত্তম ব্যক্তি হতে পারে। রাসুলের ভাষ্য অনুযায়ী ওই ব্যক্তি সমাজের উত্তম ব্যক্তি, যে নিজে কোরআন শিখে এবং অন্যকে শিখায়, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি যে নিজে কোরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।’ (বুখারি, হাদিস নং ৫০২৭)।

আমরা নিজেরাও যেমন সহিহ শুদ্ধভাবে কুরআন শরীফ শিক্ষা করব ঠিক তেমন ভাবে আমাদের সন্তানদেরকেও কোরআন শরীফ শিখাবো। সন্তানরাও কোরআন শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে। সমাজে সর্বোত্তম ব্যক্তি হবে এবং দেশের সুনাগরিক হবে। পাশাপাশি কেয়ামতের দিন তাদের জন্য আমরা বাবা-মা বিশেষ সম্মানে ভূষিত হব।

হাদীসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোরআন পড়বে ও শিখবে এবং এর উপর আমল করবে তার পিতা-মাতাকে কেয়ামতের দিন নুরের মুকুট পরানো হবে যার আলো সূর্য এর মত হবে। এবং তার পিতা-মাতাকে এমন দুটি পোশাক পরিধান করানো হবে দুনিয়া তার সমপর্যায়ের হবে না । তারপর পিতা-মাতা বলবে, কেন আমাদেরকে এই পোশাক পরানো হচ্ছে ? উত্তরে বলা হবে, তোমাদের সন্তান কোরআনকে ধারণ করার কারণে।’ (মুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস নং ২০৮৬)

আমাদের সামনে রমজান মাস আসতেছে। রমজান হল কোরআন অবতরণের মাস। এই মাসে প্রতিটা নেক আমলের সওয়াব ৭০ গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। আমাদের ওলামায়ে কেরাম এই মাসকে কোরআনের মাস বলেন। এই মাসে তারা প্রচুর পরিমাণে কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করেন। অনেক ওলামায়ে কেরাম এক রমজানে ৩০ থেকে ৪০ এমনকি ৬০ বার কোরআন খতম দিয়েছেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। আমি নিজের চোখে এমন আলেমকে দেখেছি যিনি এতেকাফের ৯ দিনে দশ খতম কোরআন শরীফ পড়েছেন।

আরও পড়ুন: সমাজ বিধ্বসংসী পরকীয়াঃ সমাধানে ইসলামী ভাবনা

সুতরাং আমরাও এই মাসে প্রচুর পরিমাণ কোরআন তেলাওয়াতের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেই। যারা সহীহ শুদ্ধভাবে কোরআন শরীফ পড়তে পারি তারা এখন থেকেই কোরআন শরিফ পড়া শুরু করে দেই। আর যারা সহীহ শুদ্ধভাবে কোরআন শরীফ পড়তে পারি না তারা এখন থেকেই শুদ্ধভাবে কোরআন পড়া শিখতে শুরু করি। নিজে কোরআন শিখি, নিজের পরিবার পরিজন সন্তানদেরকে শেখানোর ব্যবস্থা করি। আমাদের সমাজের কোনো মুসলমানের সন্তান যেন সহিহ শুদ্ধভাবে কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করা থেকে বিরত না থাকে। রাসুলের ভাষায় আমাদের সন্তানদেরকে সর্বোত্তম ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তুলি। তাহলেই আমাদের সমাজ ধীরে ধীরে সর্বোত্তম ব্যক্তিদের সমাজ হিসেবে পরিণত হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে রমজানে ও রমজান ছাড়া অন্য দিনগুলোতেও পরিপূর্ণ শুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: খতীব ও শিক্ষক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com