২৭শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ২৬শে জিলকদ, ১৪৪৩ হিজরি

রহমের ধারাপাতে সিক্ত তাড়াইলের ইসলাহী ইজতেমা

  • ইয়াছিন নিজামী ইয়ামিন

শীতের হিম-চাদর জড়িয়ে রেখেছে পুরোগ্রামকে। গ্রামের বড় মাদরাসা জামিয়াতুল ইসলাহ আল মাদানিয়া দারুল মা আরিফের প্রাঙ্গণে টাঙানো হয়েছে মাহফিলের বিশাল শামিয়ানা, সেটা কুয়াশার আর্দ্রতায় সিক্ত। নিচে মানুষগুলো পরম নিশ্চয়তায় হিম-ঠান্ডা আবহে শীতবস্ত্রের উষ্ণতায় গভীর নিদ্রায় মগ্ন। সেই নিদ্রা প্রশান্তির; বরকতের। যে সুখ বান্দার সাথে সৃষ্টিকর্তার সাক্ষাতের। এ প্রশান্তি নিষ্কলুষ।

সবাই জানে যে, আজ রাত্রিটা তাদের সাধারণ জীবন-যাপনের কোনো রাত্রির মতো নয়। যেখানে পাওয়া না-পাওয়া, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সকল হিসেব ঘুঁচে গিয়ে অন্য এক মেলবন্ধনে আবদ্ধ হবে। সে বন্ধনে কোনো মলিনতা নেই, ভেদাভেদ নেই, নেই কোনো আবিলতা। পরম করুণাময়ের দরবারে হাজিরা দিবে তারা। এর আগের রাতে সকলেই একসাথে তওবা করেছে, ইস্তিগফার করেছে, চরম অনুতপ্ততায় ক্ষমা চেয়েছে যাপিত জীবনের সকল পাপ কর্মের উপর। আজ তারা পুণ্যময়ী, নিষ্পাপ। আত্মার সজীবতায় উজ্জীবিত সকলেই। রাতের শেষভাগে তাহাজ্জুদ আর জিকিরের অনুপম ইবাদত আদায়ের প্রত্যাশায় সকলেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

শীতের আবেশের বিপরীতে শীতবস্ত্র তথা লেপ-কাঁথার উষ্ণতায় যে বিপুল সুখ; ভালোলাগা, শেষ রাতে যেন তা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। ফজরের সুমধুর আযান কর্ণদ্বারে আঘাত হানলে শীত হননের উপকরণ লেপ-কাথাঁগুলো আরো একটু ভালো করে জড়িয়ে সুখসাগরে তলিয়ে যাওয়ার প্রচন্ড অভিলাষের বিরুদ্ধাচারণের শক্তি অনেকেই হারিয়ে ফেলে। এতো পার্থিব সুখ, কতোটুকু উপভোগ্য। কেউ হয়তো এই অভিজ্ঞতার বাইরে নয়।

ফজরের ওয়াক্ত হতে আরো অনেক সময় বাকি। নীরব-নিস্তব্ধ রজনী। ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজও থমকে গেছে। চারদিকে সুনসান নীরবতা। হালকা, অথচ মিষ্টি সুরে জিকিরের আওয়াজ সুখনিদ্রার মধ্যে ভীষণ ভালোলাগা নিয়ে কানে আসছে। এ আওয়াজ কী অন্য কোনো ভুবনের! শীতের সুখনিদ্রার ভালো লাগার আবেশকে ছাড়িয়ে এর প্রাবল্য অধিক, সুধাময়ী। যেন মৃত হৃদয়ে প্রাণের সঞ্চারণ ঘটছে। এর পবিত্রতা ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসের প্রতিটি পরতে পরতে, আর প্রতিটি শিশির অনু-পরমাণুতে।

এই পবিত্র অনুভূতি জাগ্রত হয় প্রত্যেক ব্যক্তির দেহ-কান্তরে। পার্থিব সুখ-আবেশকে বিসর্জন দিয়ে সকলের মুখে প্রবাহিত হয় আল্লাহ নামের জিকিরের ফোয়ারা। যার প্রবাহ ভাসিয়ে নিয়ে যায় সকল পার্থিবতা, কলুষতা ও কদর্যতাকে।উন্মোচিত হয় খোদার প্রেমের নতুন-দুয়ার, নব্য-বাতায়ন। জিকিরে যে এতো শক্তি, এতো সুখ, এতো প্রাপ্তি! ইছাপশর-বেলঙ্কা গ্রামের তাড়াইল উপজেলাস্থ কিশোরগঞ্জের এই ইজতেমায় না এলে তা উপলব্ধি করার সাধ্য কার!

মনুষ্য জীবনে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ অনেকটাই দীর্ঘ; জটিল সমীকরণ। এতো কিছুর মধ্যে সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে এমন অনেক অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তি থাকে, যা আমাদের হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়। যার স্মরণে আমাদের বুকটা ভরে উঠে শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে, চিরমম উন্নত শির নত হয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। ‘আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ’ নামটি তেমনি একটি প্রাপ্তি। আমাদের এক মহানক্ষত্র। যার সুর আর রেশে সমগ্র পৃথিবী সুরোভিত। আচ্ছা! ফুলের সৌরভ কী সকলের সহ্য হয়? যাদের সহ্য না হয়, তাদের জন্য আমাদের অনুতাপ আর সহিষ্ণু হওয়া ব্যতিরেকে আমাদের আর কী করার আছে!

তাড়াইলের এই ইজতেমা গতানুগতিক ধারার কোনো ওয়াজ-বয়ানের মজমা নয়। সেখানে কর্ণসুখ প্রধান উদ্দেশ্য নয়, বরং অতৃপ্ত মনের সঠিক খোরাক অর্জনের পথ, সত্যিকার শান্তির উৎস, আমাদের সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য, আমাদের কাজ, আমাদের লক্ষ্য? এর প্রকৃত শিক্ষা প্রদানেই এই মোবারক মজলিসের মৌলিক ও প্রধানতম লক্ষ্য।

দিন যতই অতিবাহিত হচ্ছে, মানুষের জীবনে ততই প্রকট হচ্ছে অশান্তির কালোমেঘ। জীবনের অশান্তির এই নিকষ কালো অন্ধকারে সুখের চেয়ে মানুষ আজ স্বস্তির ব্যাকুল অনুসন্ধানী। সেজন্যই এই আধুনিক যান্ত্রিক জীবনে মানুষ আত্মার স্বস্তি ও রুহের খোরাক আস্বাদনের জন্য মরিয়া হয়ে ছুটছে দিক-বেদিক। এর প্রয়োজনই আয়োজন করা হয়েছে এই মাহফিলের। যেখানে নিহিত আত্মা ও রুহের সেই কাঙ্খিত অনাবিল শান্তি আর স্বস্তির উপকরণ! এই আয়োজন জীবনকে করে তোলে বর্ণময়, আর হৃদয়কে অপার্থিব বৈচিত্র্যময় রঙে রাঙিয়ে দেয়। এখানে শুদ্ধ হওয়ার সমীরণের যেমন কোন কৃত্রিমতা নেই, তেমনি নেই এর অপ্রতুলতা। এখানকার প্রভাত-সায়াহ্নের জিকির পাষণ্ডচিত্তকেও বিগলিত করে খোদার রহমে সিক্ত করে।

আমরা আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি, শীতের মৌসুমে গ্রামে গ্রামে সভা-মাহফিলের ব্যাপকতা ছিল। গভীর রাত পর্যন্ত চলত এগুলোর কার্যক্রম। তবে এই ইজতিমা প্রচলিত কোন ধারার সভা-মাহফিল নয়, বরং এখানে সকলের মাঝে মনুষ্যবোধকে জাগ্রত করা এবং মানবতার পরম হিতৈষী বন্ধু রাসূলে আরাবী (সা.) এর অনুপম আদর্শ অনুশীলন ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে প্রত্যেককে গড়ে তোলার প্রয়াস নেয়া হয়। বৈচিত্র‍্যে নির্মিত সরলপথ এখানে চমৎকার ভাবে ফুটে উঠে। এই মাহফিলের মধ্য দিয়ে সকলের সামনে শরয়ী মাসআলা-মাসায়েল ইসলামের রুচিবোধ সামাজিক বন্ধন ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় ইসলামের অবদান গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়। তাকওয়া ও আল্লাহভীতির চর্চা এবং তার শীলনের এক দীপিকা পাঠশালা হয়ে উঠে এটি।

এই ইজতেমার তত্ত্বাবধায়ক বিখ্যাত আলেমেদ্বীন, আত্মাধিক রাহবার, মনস্বী, ধীমান গবেষক ও বুযূর্গ শাইখুল ইসলাম আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দা.বা.)-এর আহব্বানে অনেক খ্যাতিমান আলিম বুযূর্গদের পদধুলিতে ধন্য হয় এই ভাটি-অঞ্চলের মাটি, মুখরিত হয় হাজারো মানুষের পদচারণায়। দিনভর ইলম-আমলে ব্যস্ত থাকা, সময়ে সময়ে কুরআন তেলাওয়াত আর তাহাজ্জুদের সম্মিলিত জিকির তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের প্রশান্তির সুধা হয়ে বয়ে যায় সকলের অন্তরে অন্তরে। ফজর ও মাগরিবের ছ’তাসবিহের ধ্বনি—প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করে পুলকিত এক স্বর্গীয় আবহের। রহমতের বারিধারা সিঞ্চিত করে এখানকার মাটি ও মানুষকে।

এই তিনদিন অবস্থানরত সকলের কাছে হয়ে ওঠে ইবাদতের পুষ্পাগমকাল। আসরের পর এই পুষ্পপল্লীর-ই সূর্যসন্তান, আলেমকুলের শিরোমণি, পীরে কামেল, মুফতিয়ে আ’ম, উস্তাযুল আসাতিজা, শাইখুল হাদীস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দা.বা.) সবাইকে নিয়ে মুনাজাত করেন পরম করুণাময়ের দরবারে। খোদার রাহে উৎসর্গীত হয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে যে প্রার্থনা করা হয়, তাতে হৃদয়ে জমে থাকা দুঃখ-কষ্ট, নিরাশা-হতাশা ও কদর্যতাকে হনন করে মুহূর্তেই জায়গা করে নেয় অনাবিল প্রশান্তি, স্রষ্টার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস আর অগাধ ভালোবাসা। চোখ বেয়ে নেমে আসে সমর্পণের উষ্ণ ঝরণা। রহমতের এই জোয়ারে এসে খোদার প্রাপ্তিতে যেভাবে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে বোধ–উপলব্ধি, তা প্রকাশ করা যায় কীভাবে!

একবিংশ শতাব্দীকে তাক লাগিয়ে দেয়া এই কিংবদন্তি মনীষার অপরাজেয় কৃতিত্ব এখানেই যে, খোদার করুণা আর নিজ প্রচেষ্টায় সমগ্র বিশ্বে তিনি তার স্থানকে যে উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাতে নানাবিধ কর্তব্যের চাপে নিজেকেই ভুলে যান সময়-অসময়ে। কিন্তু তারপরও আজন্ম শৈশব কৈশোর কাটিয়ে যাওয়া গ্রাম ও গ্রামের মানুষকে বিস্মৃত হননি এতটুকুও। তাদের কথা চিন্তা করে আধ্যাত্মিক খোরাক থেকে আত্মিক বিভিন্ন চাহিদার ক্ষেত্রেও ব্যাপক সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। তাঁর একেকটা কর্ম হয়ে উঠছে একেকটা উপমা। সবসময়, সবার জন্য। এগুলো পামর শ্রেণীর লোকদের গায়ের কাটা হলেও তিনি অপচিকীর্ষুদের অপচ্ছায়া দলিত করে তিনি তার গতিতে ছন্দময়; দৃঢ়ীভূত।

খোদা পাকের দরবার সবার জন্য সবসময় উন্মুক্ত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন চান, তার পথ ভোলা বান্দারা নিজেদের সমর্পিত করুক তার অফুরন্ত দয়ার-সায়রে। এটা যে আল্লাহ পাকের নিকট খুবই পছন্দনীয়। হাদীস পাকে বিধৃত হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতের যখন শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে তখন প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, হে বান্দা! আমার কাছে প্রার্থনা করো, আমি তোমার প্রার্থনা কবুল করব। আমার কাছে তোমার কি চাওয়া আছে, চাও, আমি তা দান করব। আমার কাছে তোমার জীবনের গুনাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমার গুনাহ মাফ করে দেব।’ (সহিহ বোখারি : ৬৯৮৬)

রাত জেগে আল্লাহর ইবাদত করা কিংবা শেষরাতে মহান আল্লাহর দরবারে দুফোঁটা চোখের পানি ফেলতে পারা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বৈশিষ্ট্য। এতে মহান রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি যেমন অর্জন করা যায়, তেমনি স্বাস্থ্যের জন্যও বেশ ভালো। আল্লাহ তাআলা জান্নাতবাসীদের পরিচয় দিয়ে পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘তারা শেষরাতে ক্ষমা প্রার্থনা করে।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ১৮)

এই ইজতেমা তো সেই মানুষদেরও, যারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হৃদে ফিরতে চায় পরম দয়ালুর দরবারে। এখানে আছে একজন সঠিক পথিকৃৎ, যার তত্ত্বাবধানে আমরা পৌঁছাতে পারবো প্রিয় প্রভুর সান্নিধ্যে। একজন প্রথিতযশা বিশ্বনন্দিত খ্যাতিমান আলেমেদ্বীন আপোষহীন সিপাহসালার শক্তিমান গবেষক ও লেখক আধ্যাত্মিক রাহবার পীরে কামেল হযরতুল আল্লাম ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ হাফিজাহুল্লাহ। আমরা যে শুধু শরিক হতে চাই আকাবিরদের সেই মিছিলে!

আমাদের দেশে ইসলাম প্রচার-প্রসারে সৌন্দর্য ও এর দাওয়াতকে গতিময় করতে হেন কাজ নেই, হেন দিক নেই, যেখানে তার সুদীপ্ত পদচারণা নেই! যে কাজেই হাত দিয়েছেন, সেটাই বহুগামী সফলতায় উদ্ভাসিত হয়েছে। সেরকম একটি কর্মেরই অংশ আমাদের এই ইসলাহী ইজতেমা। ইজতেমার এই তিনদিন ঈমান, আমল, জিকির-আজকার তরবিয়ত ও ইলমের প্রশিক্ষণ হয় তার তত্ত্বাবধানে। আর তার জাদুময়ী বয়ানের জন্য কতজন যে কতদূর থেকে বন্ধুর পথ মাড়িয়ে এখানে হাজির হয়েছে, তার কোন ইয়ত্তা নেই!এছাড়া তাঁর মোনাজাতে যে প্রাণ, যে সজীবতা, যে মিনতি আর যে আবেগ তা প্রকাশের ভাষা কই!

গত কোনো এক ইজতেমায় একজন বয়োবৃদ্ধের সাক্ষাৎ আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছে। ইজতেমার তৃতীয় দিন অর্থাৎ শেষদিন। সকাল থেকে কেমন একটা বিরহের আবহ অনুভব হচ্ছে। এই যে আলোর জামাত, প্রিয় বান্দাদের দল, আল্লাহর জন্য যারা একত্রিত হয়েছিল আবার আল্লাহর জন্যই যারা পৃথক হয়ে যাবে এরাই তো আল্লাহর প্রিয় বান্দা। এমনটাই তো এসেছে হাদিস শরীফে। এই বিচ্ছিন্ন হওয়ার তাড়নায় ভীষণভাবে তাড়াচ্ছে। আমাদের গ্রাম থেকে কিছুটা দূরে রশীদনগর গ্রাম। যেটা জনবসতি করে বাস উপযোগী করে তোলার পেছনে আমাদের সকলের মধ্যমণি, প্রিয় শায়খ আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দা.বা.) অবদান অনস্বীকার্য। ওখানে শতবর্ষী একটা বটবৃক্ষ রয়েছে। যার সাথে আমার আজন্ম কাটানো শৈশব-কৈশোরের অনেকটা রঙিন সময় জড়িত।

তখন আর এখনকার মত জনবসতি ছিল না। ছিল অনেক গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো মিথ। গ্রামে গেলে সময়-সুযোগে ছুটে যাই ওখানে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সেদিন সকালে মারুফকে সাথে নিয়ে বের হলাম। ভোরের আলোয় কুয়াশা কাটতে শুরু করেছে। অনেকটুকু পথ। ওখানে পৌঁছাতেই হাঁপিয়ে উঠে অনেকে। মোটামুটি দূর থেকেই চোখে পড়ল বয়সের ভারে কুঁজো হয়ে হাতের লাঠিতে ভর করে এদিকে মন্থরগতিতে আসছে এক বয়োবৃদ্ধের উপর। কাছে আসতেই দৃশ্যমান হলো সৌম্যদর্শন নূরানী বদনের একজন মুরুব্বী। সালাম দিলাম।

তিনি উত্তর দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন মোনাজাত শেষ হয়েছে কিনা?
বললাম: সাড়ে দশটায় মোনাজাত হবে।
: এখন কটা বাজে?
: আটটা, ঘড়ি দেখে বললাম।
: আপনি কোথা থেকে আসছেন? জিজ্ঞাসা করল মারুফ।
: জাওয়ার থেকে।
: এত দূর থেকে! আশ্চর্যের আতিশয্যে অস্ফুটে বের হয়ে গেল শব্দটি। বৃদ্ধের কোনো ভাবান্তর হলো না।
: পুরো রাস্তাটা কি হেঁটে হেঁটে এসেছেন? জিজ্ঞাসা করলাম, যদিও জানি এই পথে কোন প্রকার যানবাহন চলে না। তবে ট্রাক্টর, গরুগাড়ি, মহিষের গাড়ি চলে খুবই স্বল্পপরিসরে।
: হুম! উত্তর দিয়ে হাটতে শুরু করলেন।
থেমে আবার জিজ্ঞাসা করলেন, দোয়ায় শরিক হতে পারব তো?
: অবশ্যই !

বৃদ্ধ ইজতিমার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে সেটা স্পষ্ট। তারপরও চলছেন একজন বিশ্বনন্দিত আধ্যাত্মিক রাহবার মহানবুযুর্গের মোনাজাতে শরিক হতে।আর আমাদের শায়খ আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দা.বা.) এর মোনাজাতের যে আবেগ ভালোবাসা, যে বিনয় আর যে কাতরতা, মোনাজাতে শরীক হলে অনুভূত হয় কলঙ্কিত হৃদয়টা যেন বৃষ্টিস্নাত নির্মল গগনের স্বচ্ছতায় ভরে যাচ্ছে। কোনো কদর্যতা নেই, হা-হুতাশ নেই, পাওয়া না-পাওয়ার আক্ষেপ নেই, আছে শুধু প্রভুর একান্ত সান্নিধ্যে ভালোবাসায় সিক্ততা একান্ত হয়ে ওঠার আকুলতা আর আছে খোদাকে কাছে পাওয়ার ব্যাকুলতা।

এতো প্রাপ্তির মোনাজাতে কেই বা শরিক হতে না চায়। এমন একটা ঘটনার সাক্ষী হলাম মাত্র। এমন কত সহস্র ঘটনার জন্ম প্রতিনিয়ত হচ্ছে আমাদের ইজতেমাকে ঘিরে, তার হিসাব কে রাখে! কতোবার আওলাদে রাসূলেরা ধন্য করেছেন আমাদের ও আমাদের এই মাটিকে। তারা তো বটেই, কিন্তু এই বয়োবৃদ্ধের সাক্ষাৎ আমার মনে হয়েছে এমন এক বান্দার আমীন বলা এই ইজতেমা তো কবুল হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

ইজতেমাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে কতজন যে কতভাবে মেধা—শ্রম ব্যয় করেন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই! বিশেষভাবে বলতে গেলে বলতেই হয় আমার পিতা জামিয়াতুল ইসলাহ আল-মাদানিয়া মাদরাসার মুহতামিম হযরত মাওলানা সাঈদ নিজামী সাহেব (দা.বা.)এর কথা। ইজতিমা শুরু হলে এনিয়ে তাঁর পেরেশানি আর চিন্তার অন্ত থাকে না। চোখ থেকে নিদ্রা উবে যায়। কাছ থেকে দেখেছি_ইজতেমাকে কেন্দ্র করে কত রাত তার নির্ঘুমে কেটেছে। নিজেকে উজাড় করে দিয়ে কাজ করে যান দিনরাত তিনি। আবার ময়মনসিংহের মাওলানা তাজুল ইসলাম সাহেব (দা.বা.) এর কথাও বিশেষভাবে মনে পড়ছে। স্টেজ পরিচালনা ও শিডিউল ঠিক রাখা এই আয়োজনের একটি মৌলিক কাজ। তিনি এই তিনদিন নিরলসভাবে শ্রম দিয়ে যান স্বতঃস্ফূর্তভাবে। আর জামিয়া ইসলাহ আল-মাদানিয়া ইছাপশর মাদ্রাসার উস্তাদদের মেহমানদের প্রতি আন্তরিক খেদমত আর তাদের হাড়ভাঙ্গা কাটুনি প্রবাদতুল্য। সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই আয়োজনটি হয়ে উঠে মনোভীষ্ট; মনোহর।

স্বর্গীয় পবিত্রতায় আবিষ্ট দিনগুলো যেন অতিদ্রুতই অতিবাহিত হতে থাকে। পুণ্যের বর্ণাঢ্য আয়োজন আস্তে আস্তে যেতে থাকে সমাপ্তির অন্তে। যেদিন আখেরি মোনাজাতের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসে, তখন এই পূণ্যের মেলা ভঙ্গ হওয়ার বেদনায় আমাদের হৃদয়গুলো কুঁকড়ে যায়। সেদিন জামিয়া ইসলাহের উন্মুক্ত অঙ্গন জনসমুদ্রে পরিণত হয়। পাশের হাট-ঘাট-রাস্তা আর আশেপাশের বাড়ির উঠোনগুলো হয়ে ওঠে লোকে-লোকারণ্য। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই থাকেনা। একসময় সকলের মধ্যমণি হযরতুল আল্লাম মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দা.বা.) দৃঢ় পদক্ষেপে ঋজ্যু ভঙ্গিতে মঞ্চে আগমন করেন। সবার উদ্দেশ্যে আখেরি বয়ান এরপর সবাইকে নিয়ে করেন আখেরি মোনাজাত। সে মোনাজাতে কী-যে মায়া! সে-কী আবেগ!! আর নিঃষ্কলুষতা!

যারা সেখানে উপস্থিত থাকে, তারাই উপলব্ধি করতে পারেন খোদা আর বান্দার নিগূঢ় আবেদন-নিবেদন। সকল ব্যর্থতা-কদর্যতা যেন আছড়ে পড়ে তরঙ্গায়িত অনলসমুদ্রে। পাষণ্ডচিত্তও সিক্ত হয় অশ্রুজলে। প্রভুর দরবারে তার বান্দাদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস, নির্মল হয়ে ওঠে এই অঞ্চলের সমীরণ। শুদ্ধির পরশ অনুভূত হয় গায়ে-গতরে! সবার মাঝে এই অপার্থিব শুদ্ধতার দ্যূতি ছড়িয়ে পড়ে। মোনাজান্তে সকলেই যার যার বাড়ির পথ ধরে। ফাঁকা হতে থাকে রহমতে সিঞ্চিত এই প্রাঙ্গণ। আমাদের বুকটা চৈত্রের তাপদাহে চৌচির হয়ে যাওয়া মাঠের মতো হয়ে যায়! এরপর আবার আশায় বুক বাঁধতে থাকি, কবে একত্রিত হবে আলোকিত পুণ্যময়ীদের এই কাফেলা।

১১৫৮/এ, ইস্পাহান গার্ডেন, চৌধুরীপাড়া, খিলগাঁও, ঢাকা।
yasinnizamiyamin123@gmail.com

আরও পড়ুনঃ ৪, ৫, ৬ মার্চ তাড়াইলের ইসলাহী ইজতেমা

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com