আকাবিরের পদচিহ্নের খোঁজে—৩
ধিল্লু রাজার দেশে
মুফতি আব্দুস সালাম : ‘দিল্লি দিলওয়ালোঁ কা শেহ্র’ প্রবাদটির যথার্থতা আন্দাজ করতে পারলাম ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ’-এর অফিসে পা রেখেই। তাদের আন্তরিকতায় আমাকে ভুলিয়ে দিলো ‘হিল্লি দিল্লি’ ঘুরতে আসা আমি যে এক ভীনদেশী যাযাবর।
‘ঢাকায় আমাদের বাড়ি জামিআ ইকরা আর দিল্লিতে আমাদের বাড়ি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের অফিস’। হাবিবুল্লাহর উক্তিটি বেশ মুগ্ধ করলো আমাকে।
তিনধারে সংযুক্ত দ্বিতল ভবন, একপাশে মসজিদ, মধ্যখানে আছে স্বচ্ছ পানির ছোট্ট চৌবাচ্চা। চৌবাচ্চার চারপাশে নরম দুর্বাঘাসের আস্তরণ। এরিকা পামের টবে সাজানো পুরো সিঁড়ি আর আঙ্গিনা। হাঁটতে গেলে আলতো করে গা ছুঁয়ে দেয় এরিকার লিকলিকে কোমল পত্রপল্লব। কংক্রিটের শহরে সবুজায়নের প্রচেষ্টা শতভাগ সার্থক জমিয়তের আঙ্গিনাজুড়ে।
মাওলানা সাইয়্যিদ মাহমুদ মাদনীর সাথে এই রোদেলা দুপুরে সাক্ষতটা ছিলো শীতল সমীরণের মত। আমাদের খবর শুনে কিছুক্ষণ পর তবে নেমে এলেন ভারতের এই মুকুটহীন সম্রাট। ওষ্ঠে মৃদু হাসির রেখা টেনে নিরেট বাংলায় বললেন- কেমন আছেন? এই ব্যস্ততম মানুষটির মহামূল্যবান একটি মুহূর্তও নষ্ট করতে মন সায় দিচ্ছিলো না। তাই হৃদয়ে হাজারো কথা জমা থাকা স্বত্ত্বেও ‘খাছ কোয়ী বাত হেঁয়’র জবাবে ‘নেহি হজরত’, দু’আ কি দরখাস্ত’ বলেই ক্ষ্যান্ত হলাম।
মাওলানা মাহমুদ মাদানী কি জিনিস পান খেয়ে ঠোঁট লাল করা হুজুর সমাজ কীভাবে উপলব্ধি করবে? এই কূপমণ্ডুকরা যদি কাঁটাতারের ওপারে জন্মাতো তাহলে তাঁর পদধূলি নেওয়ার জন্য লুটোপুটি খেতো৷ মাওলানা মাহমুদ মাদানীর সাথে সাক্ষাৎ করে দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিটা কেটে গেলো, ভরপুর উদ্যোম নিয়ে বের হয়ে গেলাম দিল্লি ঘুরতে।
জমিয়তের অফিস থেকে দু’পা ফেল্লেই মেট্রো রেল স্টেশন। এই প্রথম মেট্রোতে চড়ার তাজরেবা হলো। দিল্লীর চলন্ত মেট্রোতে বসে আমি ভাবি— বাংলাদেশের কথা। কি একটা হুলস্থুল ব্যপারটাই না ঘটবে ঢাকায় যখন মেট্রোরেল চালু হবে! এক মিনিটে চলে যাবো মেরুল, দুই মিনিটে কুড়িল, তিন মিনিটে বারিধারা। বিশ্বাস করা যায়? এসব ভাবতে ভাবতে কখন পৌঁছে গেলাম দিল্লী জামে মসজিদ গেইটে, টেরই পেলাম না।
সাড়ে চারশো বছরের এক পুরানো মসজিদে এসে কি এক অজানা অনুভবে ভেতরটা ছেয়ে গেলো। মোগল সাম্রাজ্যের উত্থান পতনের সাক্ষী বুকে নিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে আল্লাহর ঘর এই মসজিদ; জাহানে নুমাঁ। ভেতরে মিহরাবের কাছে দুই রাকাত নামাজ পড়লাম। শাহজাহানের জন্য দুআ করলাম। লোকটার জন্য বড় মায়া হয়। মুঘল সম্রাটদের মধ্যে শাহজাহানই ছিলেন সবচেয়ে জৌলুশময় জাঁকজমক সম্রাট, ছিলেন শিল্প ও স্থাপনাপ্রেমী। আগ্রার যমুনার তীরে তাজমহল, শাহজাহানাবাদে লালকেল্লা আর এই জামে মসজিদ তার অমর কীর্তির উজ্জ্বল নিদর্শন।
মসজিদে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড়, এক বিদেশীকে দেখা গেলো গলায় ডিএসেলার ঝুলিয়ে লুঙ্গি ছেঁচড়িয়ে নিয়ে মসজিদের ভেতরে হেঁটে বেড়াচ্ছে, আর বিদেশিনী পড়েছে মুহাম্মাদ বিন সালমানের মত গাউন। আমার চোখেমুখে বিস্ময় দেখে হাবিবুল্লাহ ঘটনা খুলে বলল। হ্যাফপ্যান্ট পরে মসজিদের ভেতরে ঢুকার সময় মসজিদ কর্তৃপক্ষ তাদেরকে ধরে এই আজব পোশাক পরিয়ে দেয়৷ পর্যটকদের সাথে সাথে প্রচুর কবুতরের উড়োউড়ি দেখা যায় এখানে। আমাদের দেশে এই কবুতরগুলোর নাম জালালি কবুতর। সিলেটের হযরত শাহ জালালের মাজার থেকে এরা দিল্লি এল কীভাবে সেই রহস্যের উদঘাটন হয়নি।
মসজিদের আঙ্গিনা থেকেই ভেসে এল দিল্লির বিরিয়ানির ঘ্রাণ। লাল-সাদা বাঁশমতি চালের বিরিয়ানির ডিশ দেখে জিভে জল এসে যাওয়ার যোগাড়। গোশতে কামড় দেওয়ার সাথে সাথে খাওয়ার আগ্রহ খতম। ইন্ডিয়ায় এসে আমি যতবারই মহিষের গোশতে কামড় দিয়েছি খাওয়ার রুচি শূন্যে নেমে গিয়েছে। অথচ হাবিবুল্লাহ মহিষের গোশত খাওয়ায় দারুণ এক্সপার্ট। ইন্ডিয়ায় এসেই নাকি সে মহিষের গোশত খাওয়া শিখেছে।
জামে মসজিদের অদূরেই শাহজাহানের আরেক কীর্তি লাল কিল্লা। লাল কিল্লাকে ঘিরে রেখেছে আকাশচুম্বী প্রাচীর। প্রাচীরের চারপাশে প্রায় পঞ্চাশ ফিট লম্বা পরিখা। বাইরে থেকে শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য এটি একটি কৌশল৷ কিন্তু শাহজাহান কি জানতেন শত্রু তার ঘরের ভেতরেই ওঁৎ পেতে আছে? শত্রু তার পুত্র খোদ আওরঙ্গজেব? যাকে আমরা বলি জিন্দাপীর বাদশা আলমগীর৷ বাদশা আলমগীর ধার্মিকতার কথা আমরা ভালোই জানি, কিন্তু ধর্মের আড়ালে তার অধর্মের কথা কতটুকুই বা জানি?
স্রেফ সিংহাসনের লড়াইয়ে আপন ভাইয়ের দারা শোঁকোহর মুণ্ডুপাত করে পিতাকে উপঢৌকন পাঠানো, তরবারির জোড়ে নিজ ধর্ম অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার উদাহরণ আওরঙ্গজেব ছাড়া অন্য কোন মুঘলের ইতিহাসে পাওয়া যায় কিনা জানি না। মুখে আল্লাহ খোদার নাম যপে জন্মদাতা পিতাকে অন্ধাকার কুঠুরিতে নিক্ষেপ করে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করার ইতিহাস মুঘলদের অতীতে আছে কিনা তাও জানা নেই৷ কেউ যদি ধর্মান্ধ না হয় তাহলে আওরঙ্গজেবের ইতিহাস পড়ে মনের অজান্তেই বলে উঠবে, ‘দাদা আকবর যেমন ধর্মকে করেছে বল্গাহীন, নাতী আওরঙ্গজেব করেছে সংকীর্ণ।’
কিল্লার ভেতরে ঢুকে ভীষণ ঘুম পাচ্ছিলো, মনে চাইছিলো বের হওয়ার আগে শাহজাহানের দেওয়ান-ই খাছের ভেতরে জম্পেশ একটা ঘুম দিয়ে যাই। কিন্তু ঘুম আর দিতে পারলাম কই। সবশেষে শাহজাহানের সিংহাসন দেখতে এলাম, ছোট্ট একটি ঘরে কাঁচের ভেতর বন্দী করে রাখা হয়েছে শাহজানের রাজকীয় সিংহাসনকে। লোকজন সিংসাহনকে ঘিরে ছবি তোলায় ব্যস্ত। আমি হাবিবুল্লার কানে কানে বললাম, সাড়ে চারশো বছর পরেও এই সিংহাসন চকচক করছে কীভাবে?
লালকেল্লা দেখা শেষ, তবে ধিল্লু রাজার দেশের আরো অনেক কিছুই অদেখা রয়ে গেলো। তাজমহল কুতুব মিনার আগামী কোন দিনের জন্য রেখে দিলাম। দিল্লি নামটা নাকি ধিল্লু রাজার নামেরই অপভ্রংশ৷ মাগরীবের নামাজ পড়ে খালি পায়ে জমিয়ত অফিসের দুর্বাঘাসের সবুজ গালিচায় হাঁটছি। মৃদু বাতাসে গা জুড়িয়ে আসছে, একটু পরেই বেরিয়ে পড়বো, কোথায় যাবো জানি না।
চলবে….
লেখক : আন্তর্জাতিক ধর্মীয় বিশ্লেষক


