একটি বিজ্ঞাপন ও একজন দূরদর্শী আলেমের গল্প

একটি বিজ্ঞাপন ও একজন দূরদর্শী আলেমের গল্প

একটি বিজ্ঞাপন ও একজন দূরদর্শী আলেমের গল্প

আবু আফফান ❑ বেশ কয়েক বছর আগে গ্রামীণ ফোনের ইন্টারনেটের একটি বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম। দৌলতদিয়া ঘাটে সারি সারি ট্রাক দাঁড়িয়ে। ঘাট পার হতে হতে আজ সূর্যি মামা বিশ্রামে যাবে। তাই এই সুযোগে ট্রাকের ড্রাইভার, হেলপাররা অলস সময়ে খুব জমিয়ে কার্ড খেলায় মজে গেল।

এদিকে এক মুরব্বি চাচা ইন্টারনেটে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এই কাঠফাটা রোদে বৃষ্টির হওয়ার কথা দেখে ত্রিপল দিয়ে আগে নিজের ট্রাকের মাল কষে বাধল তারপর সবাইকে বলতে লাগল, একটু পরে বৃষ্টি হবে বৃষ্টি হবে যার যার ট্রাকের মাল বাধ। আর চাচা যায় কোথায়? টাটকা রোদের ধোঁকায় পড়ে সবাই তাকে আচ্ছামত ধোলাই করল, যাচ্ছেতাই বলে তুলোধুনো করতে কার্পণ্য করল না কেউ। বেচারা প্রবীণকে উপহাসের পাত্র বানিয়ে তারা আবার কার্ড খেলায় মন দিল।

চাচা মুচকি হেসে তাদের কথার জবাব দিল আর বৃষ্টির তামাশা দেখতে নিজ জায়গায় যেয়ে বৃষ্টির অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকল। মিনিট দুয়েক পর কাল মেঘের চাদরে ঢেকে গেল গোটা দৌলতদিয়ার আকাশ, তারপর শুরু হল আসমান ভাঙা বৃষ্টি। এবার তো খেলোয়াড়ের দল পড়িমরি করে ত্রিপল টানাতে ব্যস্ত কিন্তু ততক্ষণে বৃষ্টি তার কাজ সেরে ফেলেছে! হা হা হা!

এবার আসি মূল গল্পে! করোনার তান্ডবে স্থবির গোটা দুনিয়া। সব কিছু বন্ধ থাকলেও সীমিত পরিসরে চলছে কিছু কিছু, তবে কোন পরিসরেই চলছে না শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মাদ্রাসাগুলো তাদের স্বপ্নের যাত্রা শুরু করে রমজানুল মুবারকের শেষে শাওয়ালের শুরুতে কিন্তু এবার করোনায় সাধল বাধ। বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন তাহলে কি এবার হাদিসের দরস যথাযথ সময়ে হচ্ছে না?! তাফসির, ফিকহের ক্লাস যথারীতি শুরু হবে না?! ইয়া মা’বুদ! না! সব কিছুই চলবে যথারীতি, সুচারুরূপে, সুন্দরভাবে। কিন্তু কিভাবে?!

একজন দূরদর্শী আলেম পথ দেখালেন অফলাইনের পরিবর্তে কিভাবে অনলাইনে দেওয়া যায় দরস। এভাবেই একদিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে শুরু হয়ে গেল জামি’আ ইকরা বাংলাদেশের ক্বলা ক্বলার মুবারক দরস। এবার তাহলে প্রশ্ন জাগে, কওমি অঙ্গনে আলোড়ন তৈরি করা অনলাইনে হাদিসের দরস কে শুরু করলেন? হ্যাঁ বলছি শুনুন! মাদ্রাসা অঙ্গনে যিনি অভিনব এ ধারা চালু করলেন তিনি আর কেউ নন, আমাদের সবার পরিচিত এক দূরদর্শী সত্তা, সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব, আধারে আলোর মশাল, চেতনার বাতিঘর, দেওবন্দিয়াত পুনর্জাগরণের মহান পুরুষ ‘আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ’।

মজার বিষয় হল যে, দেশের বৃহৎ কওমি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার নির্বাচন নিয়ে যখন সারাদেশের চোখ চট্টগ্রামে তখন অনলাইনে চলছে যুগান্তকারী পদক্ষেপ দরসে হাদিস! সুবহানাল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! দূরদর্শী এ আলেমের দূরদর্শিতার গল্প কি এখান থেকে শুরু? না! দূরদর্শিতার গল্প শুনতে ফিরে যেতে হবে আজ থেকে ৪৮ বছর পূর্বে ১৯৭১র মুক্তিযুদ্ধে।

এক. বাংলার আলেম সমাজ স্বদেশকে এক পাশে ফেলে পাকিস্তানের পক্ষে সরব। বাংলাদেশের কথা কল্পনাও আনতেন না তাঁরা। সেই তখন দেশকে স্বাধীনতার স্বাদ পাইয়ে দিতে মহান মুক্তিযুদ্ধে নিরবে নিভৃতে নাম লেখান এই মহান মানুষটি দেশ মাতৃকার সেবায় ঝাপিয়ে পড়েন মুসলমান নামের কলংক পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। বিজয়ের মালা গলায় পরেই ফিরে আসেন আপন গৃহে। আহ! সেদিন যদি এ দেশের সব আলেমই তাঁর মতো দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে লড়তেন, তাহলে আজ আমরা মাথা উঁচু করে চলতাম। আফসোস!

দুই. দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু কওমী অঙ্গনে ভাষার স্বাধীনতা তখনো ফিরেনি। যে দেশের রাষ্ট্রভাষার জন্য শহিদ, রফিক, জব্বার, বরকত বুকের তাজা রক্ত ঢেলে রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে পাকিদের কাছ থেকে উদ্ধার করেছে
স্বাধীনতার পরও সে ভাষা গুমড়ে কাঁদছিল কওমি অঙ্গনের দরসে। জাতীর শ্রেষ্ঠজনেরা আপন সন্তান বাংলাভাষাকে অনাদরে অনাহারে ফেলে রেখে পরের সন্তানকে জামাই আদর করছিল, দুধ কলা খাইয়ে পুষছিল! ঠিক তখন আলেম সমাজেরই একজন ঘরের ছেলে বাংলা ভাষাকে পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে নিলেন, তার ধূলামলিন চেহারা থেকে সযত্নে ধূলাবালি সাফ করলেন। কওমি অঙ্গনে তার স্থায়ী ঠিকানা করে দিলেন।

প্রিয় পাঠক! কে সে জন? জানতে কি মন চায় না কওমি অঙ্গনে বাংলাভাষার সেই দয়ালু অভিভাবকের মহান নাম? জ্বি! তিনি এই মাটির শ্রেষ্ঠ সন্তান একজন ‘আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ’।

তিন. দেশকে রসাতলে নিতে যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছে, দিনরাত একাকার করে পাকিস্তানি প্রভুদের চরণতলে সেজদা করেছে তারাই হল সর্বকালের নিকৃষ্ট, দেশদ্রোহী, জঘন্য, অসভ্য, বর্বর, রাজাকার, আলবদর, আল-শামস গ্রুপ তথা জামাত শিবির। এরা মহান মুক্তিযুদ্ধ চায়নি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি, চায়নি বাংলাদেশের মঙ্গল। তারা চেয়েছে দেশকে আজীবন পরাধীনতার জিঞ্জিরে আবদ্ধ রাখতে, ধর্মের নামে গুম, খুন, সুদ, মদ, ব্যভিচার, জুলুম, লুটতরাজ, রাহাজানির প্রচার প্রসার ঘটাতে। এক সময় বাংলার সরলমনা মানুষ এদের চক্রান্তের জালে পা দিয়ে ফেলছিল প্রায়। ঠিক এহেন নাযুক পরিস্থিতিতে এদের ষড়যন্ত্রের বহুরূপী মুখোশ সবার আগে যিনি ছিন্ন ভিন্ন করেছেন তিনিই কিন্তু হক্বের আকাশে জ্বলজ্বল করা এক নক্ষত্র আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ ।

চার. যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসীর দাবিতে উত্তাল শাহবাগ, সাথে সারাদেশ। বিশ্ব মিডিয়ার চোখ তখন ২৪ ঘন্টার জন্য শাহবাগে। অথচ তখনও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান দাবীদাররা আশ্চর্যজনক ভাবে নীরব অথচ বিপক্ষে সরব! তাদের এই নীরবতায় দেশবাসীসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গন ধরেই নিয়েছে টুপি-দাড়ি মানে জামাত শিবির! আসতাগফিরুল্লাহ!! কিন্তু না! এটা হতে পারেনা, হতে দেওয়া যায়না। মর্দে মুজাহিদ কাসেম নানুতুবী, শায়খুল হিন্দ আর মাদানী রহ. ভাব শিষ্য, দারুল উলুম দেওবন্দের এক সূর্য সন্তান কালবিলম্ব না করে সেই মুহুর্তে সকল নীরবতা ভেঙে খাঁটি নবীর ওয়ারিশ আর নামধারী ইহুদিদের দালাল জামাত শিবিরের মাঝে পার্থক্য সুস্পষ্ট করতে কওমী অঙ্গন থেকে সবার আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে শাহবাগ চলে গেলেন, বিশ্ববাসীর সামনে হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য সুস্পষ্ট করে দিলেন। তাঁর সেদিনের দূরদর্শিতার কারণে আমরা কওমিয়ানরা ভবের বাঁচা বেঁচে গেছি, তার টাটকা সুফল ঘরে তুলেছি। আজও ভোগ করছি তাঁর সেদিনের দূরদর্শিতার ফল।

পাঠক! সেদিন সকল বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে, বাতিলের রক্ত চক্ষু থোড়াই কেয়ার করে বীরদর্পে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়া সেই মর্দে মুজাহিদ কে জানেন তো? হ্যাঁ! তিনিই ‘আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ’।

পাঁচ. ইসলামের পবিত্রতম এক ইবাদতের নাম জিহাদ। অথচ এই জিহাদকেই কলুষিত করার লক্ষ্যে একদল লেবাসধারী আলেম সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের সাথে জিহাদকে গুলিয়ে ফেলল। তারা ভাবল সব জোশের নামই জিহাদ! একদিকে আই.এস.-এর যন্ত্রণায় অস্থির গোটা পৃথিবী। অপরদিকে এদেশে সাধারণ মুসলমানদের বিভ্রান্তিকর ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে উগ্র বানাচ্ছিল একদল বাজারি বক্তা। এই বাংলায়ই কিছু জঙ্গী হলি আর্টিজান বেকারিতে জিহাদের নামে নৃশংস হত্যাকান্ড চালাচ্ছিল! অন্যদিকে নাস্তিক নাস্তিক স্লোগানে যার তার উপর হামলে পড়ছিল কিছু ভ্রান্ত যুবক!

দেশ ও জাতীর এহেন ক্রান্তিলগ্নে শীতল মস্তিষ্কে ইসলাম ও মুসলমানদের বাঁচাতে যিনি নীরবে ইসলামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের অবস্থান সুস্পষ্ট করতে এক লক্ষ আলেমের স্বাক্ষর সম্বলিত ফতোয়া প্রকাশ করে ইসলামের বিরাট এক তাজদিদি খেদমত আঞ্জাম দিলেন তিনিই কিন্তু রাহবারে মিল্লাত, যুগের মুজাদ্দিদ ‘আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ’।

ছয়. শতবর্ষী দ্বীনি এক বরকতি মেহনতের নাম দাওয়াত ও তাবলীগ। কিন্তু এ মুবারক মেহনতের উপর কতিপয় নামধারী মুনাফিক মুসলমানের শ্যেনদৃষ্টি পড়ল, মুবারক জামাতের মাঝে ফাটল ধরাতে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমে পড়ল, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাবলীগ বিভক্তির আন্দোলনে যুক্ত হয়ে গেল। ওযাহাত আর এতাআত নামে যখন চূড়ান্ত কিছু হয়ে গেল তখন এই একজন দূরদর্শী আলেম বিশ্রামের বয়সে নিজের কথা ভুলে উম্মতের ব্যথায় ব্যথিত হয়ে আবারো সরব হলেন তাবলীগ বাঁচাতে উলামা ও উম্মাহকে বাঁচাতে।

সবাইকে সতর্ক করে বললেন, আলেম থেকে যদি উম্মাহ দূরে সরে যায় তাহলে তারা হবে হেদায়েত থেকে বঞ্চিত
আর উলামায়ে কেরাম হবেন নির্যাতিত! সুতরাং কেউ কারো থেকে আলাদা হওয়া যাবেনা। উম্মতকে একই সুতোয় গেঁথে রাখতে তিনি নিলেন যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই বৃদ্ধ বয়সে অসহায় উম্মতের কথা ভেবে পথযাত্রার নামে সফর শুরু করলেন গোটা বাংলাদেশ। নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে জেলায় জেলায় যেয়ে মানুষকে বুঝাতে লাগলেন উলামায়ে কেরাম থেকে দূরে থাকা যাবে না আর আওয়ামকেও দূরে সরিয়ে দেওয়া যাবে না।

আহ! কোথায় পাবে তুমি এমন দরদী রাহবর?! আজ হজরত আবু জর গিফারী রা. নেই কিন্তু তাঁর সেই ব্যথা, তাঁর সেই ঈমানী দৃঢ়তা আর উম্মতপনা আমরা দেখতে পাই আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের মাঝে সুবহানাল্লাহ! পথযাত্রার পর পরই জেলায় জেলায় যাওয়া শুরু করলেন উম্মতের ইসলাহের জন্য, উলামায়ে কেরাম থেকে যেন দূরে সরে না যায় সে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। কত সুন্দর আইডিয়া তাঁর মাশাআল্লাহ। বাহবা আর মুবারকবাদ জানানোর কোন ভাষা কি আছে এমন উম্মত দরদী মানুষের জন্য?

প্রিয় পাঠক! হযরতের দূরদর্শিতার এমন গল্প কয়টি শুনবেন, অভাব নেই। পৃষ্টার পর পৃষ্ঠা শেষ হবে কিন্তু এত তাড়াতাড়ি দূরদর্শিতার মজার মজার গল্প শেষ হবে না।

এবার আবার ফিরে যাই বিজ্ঞাপনে। ইন্টারনেটের সাহায্যে বিজ্ঞাপনের চাচা যেমন সবাইকে মেঘ থেকে সতর্ক করেছে, সবার মাল সামানা নিরাপদ রাখতে চেয়েছে ঠিক তেমনি খোদা প্রদত্ত বিরল গুণে গুণান্বিত হয়ে দেশ ও জাতীকে বাতিলের চমকপ্রদ বিভ্রান্তি থেকে সদা সর্বদা সতর্ক করতে তৎপর আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ নামের মহীয়ান সত্তা। কিন্তু যারা কার্ড খেলায় মগ্ন তাদের কানে কি সতর্কবার্তা পৌঁছায়?! পৌঁছালেও কি তারা সতর্কবার্তা কানে তুলে? অভাগা জাতীতো বর্ষীয়ানকে বিশ্রী বিশ্রী ভাষায় টিপ্পনী কাটে, ওরা নেশায় মত্ত হতচ্ছাড়া ড্রাইভার হেলপার আর কন্ডাক্টরদের মত যারা মুরব্বি চাচাকে বলে কার্ড খেলতে পার না তাই আমাদের খেলা দেখে হিংসায় জ্বলছে যাও এখান থেকে। হায়রে কপালপোড়া জাতি!

পরিশেষে বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান সাহেবের ভাষায় বলে যাই- ‘যিনি বাঙময় বর্গমাইলে হাজার ছাপ্পান্ন, সহস্র বছর বাঙালির তপস্যায় একজন ফরীদ মাসঊদ জন্মায়!’

লেখক: প্রাবন্ধিক ও সমাজ বিশ্লেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *