তাবলীগে বিভক্তি, চলমান সঙ্কট ও বিবাদ এবং কেন এই বিভক্তি? কী এর সমাধান? এসব নিয়ে ‘ইজতেমার বর্তমান, ভবিষ্যৎ’ শিরনামে ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনে ২২ জানুয়ারি মঙ্গলবার রাতে একটি টকশো অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই টকশোতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান, শোলাকিয়া ঈদগাহের গ্র্যান্ড ইমাম, শাইখুল হাদীস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক শামীম মোহাম্মদ আফজাল, তাবলীগ জামাতের পুরনো সাথী মাওলানা আশরাফ আলী ও ইজতেমা ময়দান কমিটির সদস্য এবং শুরা কমিটির সদস্য মাওলানা মাহফুজ হান্নান। ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের টকশোতে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের আলোচনার একটি অনুলিপি পাথেয় টোয়েন্টিফোরের পাঠকের জন্য তুলে দেয়া হলো—
ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন : তাবলীগ জামাতের এই দ্বন্দ্ব ও বিশ্ব ইজতেমার বিষয় এখন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে এবং হাইকোর্ট বলছে, এই বিষেয় মন্তব্য করা লজ্জার। আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ, আপনি কী মনে করেন এই বিশ্ব ইজতেমা আর একসাথে করা সম্ভব হবে? হলে কীভাবে?
আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। ধন্যবাদ আপনাকে। আমিও হাইকোর্টের সাথে একমত পোষণ করছি। তাবলীগের এই বিরোধ সব জায়গায় আছে, কিন্তু পৃথিবীর কোথাও বাংলাদেশের মত এমন পরিস্থিত হয়নি। বাংলাদেশে যেই পরিস্থিতিটা হয়েছে, এই পরিস্থতির কারণে এখন বাইরে গেলে লজ্জায় মুখ ঢাকা ছাড়া কোন উপায় থাকে না। আমি কিছুদিন আগে আবুদাবীতে একটা কনফারেন্সে গিয়েছিলাম। মক্কা শরীফেও কনফারেন্সে গিয়েছিলাম। এরও কিছুদিন আগে আমেরিকাতে একটি কনফারেন্সে গিয়েছিলাম। তাবলীগ জামাতটা যেহেতু বিশ্বব্যাপী, তাই সবখানেই দুই পক্ষের লোকজন আছে। কিন্তু সবাই আশ্চর্য হয় এই নিয়ে যে, আমাদের বাংলাদেশে এই পরিস্থিতিটা কীভাবে সৃষ্টি হলো। তাই হাইকোর্টের সাথে আমি একমত, আমারও এই বিষয়ে কথা বলতে লজ্জা হয়।
ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন : বাংলাদেশের এই পরিস্থিতির জন্য আপনি কাকে দায়ী করছেন মূলত। মাওলানা আশরাফ আলী বলেছেন, এর পিছনে কোন চক্রান্ত থাকতে পারে।
আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : আমাদের দেশে তাবলীগ জামাত একসাথে হতে পারবে না এটা অসম্ভব। আমি অসম্ভব মনে করি না। আমি এটাকে সম্ভব মনে করি এবং এটা সম্ভব হওয়া উচিৎ বলেও মনে করি। তাবলীগ জামাতের বিষয়টা, বিশেষ করে বিশ্ব ইজতেমাটা, এটা আমাদের দেশের জন্য বিরাট এক মর্যাদা ও গৌরবের বিষয়। আমরা এটা বুক ফুলিয়ে বলি। সুতরাং এই গৌরবকে রক্ষা করতে হলে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আর আমি কাউকে দোষারুপ না করেই বলবো, এর পিছনে যদি কারো কোন স্বার্থ বা জেদ থাকে, তাহলে আমি আল্লাহর ওয়াস্তে সকলকেই অনুরোধ করবো যে, সবাই একটু এমন জায়গায় আসেন, যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়া যায়। ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অনেক জায়গা আছে।
ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন : জনাব মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ, আপনি বলছিলেন সবাই একসাথে মিলিয়ে দেওয়ার জন্য আপনার কিছু পরামর্শ আছে। আপনি যদি এই পরামর্শগুলো একটু দেন। আর দেওবন্দের বক্তব্য এবং মাওলানা সাদ’এর বক্তব্য যেগুলো নিয়ে ডিসপিউট হচ্ছে, এই ব্যাপারে একটু জানতে চাই।
আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : দেওবন্দের বক্তব্যের সাথে আমি কখনোই দ্বিমত পোষণ করি না। তবে উনি যেভাবে দেওবন্দের বক্তব্যের তরজমা করছেন তরজমা এইভাবে কিনা, এই নিয়ে বলার অবকাশ থাকে। আমি দেওবন্দ যেভাবে বলছে এইভাবেই চলতে চাই। দেওবন্দ সারাবিশ্বের অনুকরণীয় একটা প্রতিষ্ঠান এবং দেওবন্দকে অনেকেই মানেন। এখন দেওবন্দ যে কাজটা করেছে, এই কাজটা হলো, দেওবন্দ কেবল তার মতামতটা জানিয়ে দিয়েছে। এরপরে ঝগড়া-ফাসাদ করা, মারমারি করা, একজন আরেকজনকে মসজিদ থেকে বের করে দেয়া, এই কথা তো দেওবন্দ বলে নাই। আমার আফসোসটা হলো, দেওবন্দ সাদ সাহেব সম্পর্কে বলছে যে এই ধরনের। এখন সাদ সাহেবকে যারা ইজতেমায় আনতে চায় তারা বুঝবে, আর যারা আনতে চায় না তারা বুঝবে। কিন্তু কথা হলো মারামারিটা কেন হবে? তাহলে কী আমি দেওবন্দকে মানলাম। কিছুদিন আগে পাকিস্তানের বড়বড় ছাব্বিশ জন আলেম একত্রিত হয়ে ছিলেন। মাওলানা তাকী উসমানী ও রফী উসমানীর নেতৃত্বে তারা বলেছেন, আমাদের প্রত্যেকেরই তাবলীগ জামাতের সবাইকে একসাথে করে দেয়া জন্য চেষ্টা করা উচিৎ। আর সবাইকে নিরাপদে কাজ করতে দেয়া উচিৎ। আমিও এটা চাচ্ছি। বাংলাদেশ একটা স্বাধীন দেশ। এখানে যে কেউ এসে কথা বলতে পারে তার এই স্বাধীনতা আছে। এখন সরকার যাকে এলাও করবে সে এই দেশে আসবে। সবাই সরকারের কাছে তার মত পেশ করতে পারবে। আমি কারো মারামারিটা পছন্দ করছি না।
ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন : মাওলানা মাসঊদ, মারামারি কথাটা আমরা যদি বাদও রাখি, কিন্তু আপনার কাছে কী এটা মনে হয় নাকি যে, মাওলানা সাদ যেসব কথা বলেছেন এইগুলো ভুল। সেটা মসজিদের ইমাম সাহেবের ব্যাপারে হোক বা নবী রাসূলদের সমালোচনা হোক।
আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : আমি এক কথাই বললাম, দেওবন্দ যা বলেছে আমি এই ব্যাপারে একমত। কারণ আমি সাদ সাহেবকে নিয়ে বিশ্লেষণ করি নাই। তার বক্তব্যও তেমন শুনি নাই। আমি একটা বিষয় জানতে চাচ্ছি, বাংলাদেশের যে তাবলীগের কাজ হচ্ছে সেটা কি দিল্লির নিজামুদ্দীনের শাখা সংগঠন হিসেবে, নাকি বাংলাদেশে এটা স্বতন্ত্র। এই বিষয়টা পরিষ্কার হলে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হবে। আমি যা দেখতেছি, এই যে শুরার কথা বলতেছেন, এই শুরা একটা কেন্দ্র থেকে। আর দিল্লি কেন্দ্র ছিল একদম তাবলীগের শুরু থেকে নিয়ে। দিল্লির কেন্দ্রকে কেউ এখন অস্বীকার করে না। এখন ব্যাপারটা হলো, কেন্দ্র আমীর নিয়ে। আমীরের ব্যাপারে এতদিন পর এসে প্রশ্ন আসছে, অমুককে আমীর মানবো, তমুককে আমীর মানবো না। কিন্তু দিল্লির কেন্দ্রীকতাকে পৃথিবীর কোন তাবলীগি অস্বীকার করে না।
আমি আবার বলবো, হাতজোড় করে বলবো, প্রত্যেকেই নিজের ইগোকে বাদ দিয়ে, কুরআন ও হাদীসের ক্ষুদ্রতম বিন্দুতে হলেও আসেন। যেমন একটা কথায় আসেন, কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা বলছেন, শুধু মুসলমানদেরকে বলেন নাই, সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, ‘তায়ালাও ইলা কালিমাতিন সাওয়াইন বাইনানা ওয়া বাইনাকুম’ একটা কথার উপর তোমরা আসো, যার মধ্যে আমরা তোমরা সমান। তাই আমরা একসাথে বসে আগে বের করি যে, আমরা কোন কথাটার মধ্যে একত্র হতে পারি।
ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন : জনাব ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : আপনাকেও ধন্যবাদ। শুকরিয়া।
ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের টকশোটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন
https://www.youtube.com/watch?v=wbnAtfd1HHU&feature=youtu.be&fbclid=IwAR1wZNFKMrGR0V91KFluAQFDclkHegJMwwyL7yoGKMPux_dJ-0GYYcu3JGM
ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের টকশোতে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের আলোচনাটি গ্রন্থনা ও সাজানোর কাজ করেছেন পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর সহযোগী সম্পাদক মাসউদুল কাদির ও সহসম্পাদক আদিল মাহমুদ।


