***
আদিল মাহমুদ ● শীতের সকাল। বাতাসে হিম ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব। চারিদিকে কুয়াশা ঘেরা। ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দু। গাছের ঝরা পাতার মর্মর ধ্বনি। কনকনে শীতে জবুথবু একটি গ্রামের ভোর—আমি খুব কাছ থেকেই দেখেছি। শৈশবে গ্রামে শীতের এক আলাদা অনুভূতি অনুভব করেছি। দেখেছি কুয়াশায় আচ্ছন্ন ভোরে—বাড়ির পশ্চিম পাশের বিশাল পুষ্পিত সরিষাখেত, সবুজ রং ধরা গমখেত, টমেটো, কাচামরিচসহ বিভিন্ন ধরনের সবজিখেত। কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ ভেদ করে পূর্ব দিকে সূর্যের আলো উকি দিয়ে ফুটে ওঠা মিষ্টি রোদও আমি দেখতে ভুল করিনি।—
ভোরের কাঁচা রোদ—হিমেল হাওয়া প্রাণে তুলে শিহরণ। শীতে প্রকৃতিকে নতুন করে আবিষ্কার করি। কুয়াশায় আচ্ছন্নতা ঘিরে রাখা চারপাশে—দিনের সূর্য ঢেলে দেয় মায়াবি রোদ। রাতের আকাশে রূপালি তারা খচিত শুভ্রতা ছড়িয়ে পড়ে। চাঁদের ধবধবে সাদা জোছনার পূর্ণিমা হয়ে ওঠে—শিশির ধোয়া রূপার থালা। শিশির ভেজা এই সময়ে প্রকৃতিতে সৌরভ ছড়ায়—শীতের ফুল। শীতকালীন ফুলে রঙিন হয়ে ওঠে—গ্রাম। অতিথি পাখির আনাগোনায় মুখরিত হয়ে ওঠে—নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর, ঝিল, জলাশয় ও বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। পাখির গুঞ্জনে জেগে ওঠে—নতুন রূপে।
শীতের মিঠে রোদ, কুয়াশার চাদর, মাটির চুলায় রান্না, চুলার পাশে বসে বসে হাতের তালু গরম করে নেয়া, চায়ের কাপের সাদাটে ধোঁয়া, হলুদের ডালি বিছানো সষের্র মাঠ, হাট বাজারে ক্যাম্পাছারের মজমা, গ্রামের স্কুল কিংবা খেলার মাঠে যাত্রাগানে মাতোয়ারা— এসব গল্প এই শীতকে ঘিরেই।
আকাশে ছন্নছাড়া নীল-শুভ্র মেঘ। পাখিদের কিচির-মিচিরে মুখর থাকে গ্রাম। হৃদয়ে আসে প্রেমের বার্তা। গ্রীষ্মের মাঠ-ঘাট ফাটা প্রখর তাপ—বর্ষায় নূপুরের শব্দে অবিরল বারিধারা—শরতের স্নিগ্ধতা ও স্বচ্ছতা পেরিয়ে আসে ঋতুরাণী হেমন্ত। হেমন্তের হাত ধরেই আগমন শীতের। মাঠের সোনালি ধান গোলায় ভরার পর—আনন্দে মেতে থাকা মানুষের শরীরে লাগে শীতের কাঁপন। বাতাসে শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনির সাথে গাছের পাতাগুলো বিবর্ণ রূপ ধারণ করে। একটা সময়ে গাছের পাতা ঝরে পড়ে—বাকি গাছের পাতাগুলো ধুলাবালি মেখে কদর্য রূপ ধারণ করে।
খেজুরের রস, পাটালি গুড়, কোঁচাভর্তি মুড়ি-মুড়কি, পিঠা-পায়েস, খড়-পাতার আগুন তাপানো, গমের ক্ষেতে পাখি-তাড়ানো, লেপ-কম্বলের উত্তাপ, কুয়াশা ঢাকা ভোরে ও সন্ধ্যায় আনন্দের শীত গ্রামের জনজীবনকে রাঙিয়ে তুলে। শীতের মিঠে রোদ, কুয়াশার চাদর, মাটির চুলায় রান্না, চুলার পাশে বসে বসে হাতের তালু গরম করে নেয়া, চায়ের কাপের সাদাটে ধোঁয়া, হলুদের ডালি বিছানো সষের্র মাঠ, হাট বাজারে ক্যাম্পাছারের মজমা, গ্রামের স্কুল কিংবা খেলার মাঠে যাত্রাগানে মাতোয়ারা— এসব গল্প এই শীতকে ঘিরেই।
শিশির বিন্দুকে দেখে মনে হয় কিশোরী মেয়ের নাকফুল। শিশিরের নূপুর পায়ে শীত সমাগত হয় আমার গ্রামের মাঠে ঘাটে। শীত এলে কুমড়ো ফুল হাসে—দূর্বাঘাস শিশিরের নূপুর পায়ে চলে।
মাঠের পর মাঠ জুড়ে ফুটে থাকা—সরিষা যেন বিছিয়ে রেখেছে হলুদ ফুলের চাদরে। এই ফুল ও কলিদের উপর উড়ে চলা রঙ্গিন প্রজাপতি আর মৌমাছিদের নৃত্যে মন কাড়ে। গ্রামের চা দোকানে ভোর হতে জমতে থাকে আড্ডা। সবাই যে যার মতো শীতের চাদর—সোয়েটার গায়ে দিয়ে গল্পে আড্ডায় মেতে ওঠেন নিজেদের মতো করে। শুকিয়ে যায় নদী-নালা—খাল-বিলের পানি। কোথাও হাঁটুজল—কোথাও খটখটে চর জাগে। গ্রামের কিশোর-কিশোরীরা মেতে ওঠে অল্প পানিতে মাছ ধরার উৎসবে। সেইসঙ্গে খাবারের খোঁজে খাল-বিল আর মাঠে-ঘাটে নামে সাদা বকের ঝাঁক। সাদাফুলের মত বসে থাকা বকের শুভ্রতায়—এক অপরূপা দৃশ্য তৈরি হয়। শুকনো পুকুর বা ডোবার তলায় মেয়েরা কুতকুত—বউছি আর ছেলেরা হাডুডু বা দায়রাবান্দা খেলে। কেউবা খেলে কানামাচি ভোঁ ভোঁ।
সকালে ছেলেমেয়েরা দলবেঁধে মক্তবে যায়। গাছ থেকে খেজুর রস নামায় গাছি—রসের গন্ধে চারিদিক মৌ মৌ করে। দূর্বাঘাসের মাথায় বিন্দু বিন্দু শিশির ফোটে। কলমির ডগা আর বেগুন গাছের মাথায় কুয়াশা জমে থাকে। সে শিশির বিন্দুকে দেখে মনে হয় কিশোরী মেয়ের নাকফুল। শিশিরের নূপুর পায়ে শীত সমাগত হয় আমার গ্রামের মাঠে ঘাটে। শীত এলে কুমড়ো ফুল হাসে—দূর্বাঘাস শিশিরের নূপুর পায়ে চলে।—
মুক্তগদ্য। শীত। ভাটিদিহি। কানাইঘাট। সিলেট


