রবীন্দ্রনাথের ফুলজানি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : রবীন্দ্রনাথের গ্রন্থ সমালোচনা। বইটি শ্রীশ্রীশচন্দ্র মজুমদারের। আমি পড়ি নি। তা হলে কি হবে? রবীন্দ্রনাথ যখন একটি গ্রন্থ সমালোচনা করেন তখন বইটিকে এমন করে পড়ে নেন, যে তার নির্যাসটুকু মনের মধ্যে রয়ে যায়। এখন মনে হচ্ছে যে বইটি আমি পড়েছি এবং শুধু তাই নয়, প্রতিটি বাক্যের সঙ্গেও আমার দেখা হয়েছে।
এই বইটি পড়ার সুযোগ যিনি পাবেন না, তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘ফুলজানি’ অনেকটা পেয়ে যাবেন। আর আপনারা পড়ছেন গ্রন্থ সমালোচনার আলোচনা। তাতে আর কতটুকু পাবেন? কেন? শহরে বিচিত্র জটিল ঘটনা, লোকজনের গতিবিধি, গাড়িঘোরা কলকারখানার সমস্ত মানুষ যখন ছোট হয়ে যায়, তখন শহরে এসে কে বাঁচল আর কে মরল, তার খবর ক’জনই বা রাখে। কিন্তু পল্লী জীবনের কথা আলাদা। সেখানে ছোটখাটো নদী-নালা, পুসকরণী, মাঠ-ঘাট, পশুপক্ষী, রোদ্দ বৃষ্টি সবই চোখের সামনে নতুন রূপে প্রতিভাত।
তাই ‘ফুলজানি’ মানুষের অন্তরে যে আপন রঙ্গভূমি প্রস্তুত করে গ্রাম্য জীবনে তার কথা নির্মল হাস্যকৌতুকে ব্যক্ত হয়। রবীন্দ্রনাথকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ে গিয়েছেন শ্রীশবাবু। সেখানে বড় একটা যাওয়া হয়ে ওঠে নি তার। তা হলে এক সঙ্গে ‘ফুলজানি’ পড়লে দুইটি লাভ। নায়িকা কালি, যার স্বভাবটি যেমন মিষ্টি তেমনি দুষ্ট, তেমনি স্বাভাবিক। গ্রন্থের নায়িকা ‘ফুলকুমারী’। শূণ্যপটে যেন কালিকেই অঙ্কিত করে তুলেছেন।
নায়ক পুরন্দর। অসাধারণ হয়ে ওঠার আগেই তিনি পাঠকদের আশায় ছাই দিয়েছেন। ঠিক যেন ‘আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হায় তাই ভাবি মনে’। এভাবে গল্প এগিয়েছে যা বাংলাদেশেই সম্ভব। পুরন্দর মৌলভীর কাছে হাফেজ পড়িয়ে এবং পণ্ডিতের কাছে শাস্ত্র অধ্যায়ণ করে নতুনতর মানুষে বিকশিত হল। তার মধ্যে সংসার বৈরাগ্যের চিহ্ন ফুটে উঠল, যা পাঠকদের তেমন পছন্দ নয়।
এমনিভাবে প্রতিটি চরিত্রের সঙ্গে পাঠকের কোনখানে পরিচয় নিবিড় হল তা রবীন্দ্রনাথ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করেছেন যাতে এই বইটি পড়তে তার পাঠকদের আগ্রহের সৃষ্টি হয়।
আধুনিক সাহিত্যে উপন্যাস যে জটিলতা উপস্থাপন করে আমার দৃষ্টিতে ‘ফুলজানি’-তে ঘটে নি। তা হলেও পল্লীর দেখা আর শহরের দেখা এক নয়। তা বোঝা যায় বাংলাদেশীয় পল্লীর ছেলে মনের ঘোড়াকে কেমনভাবে চালান শ্রীশবাবু তা পর্যবেক্ষণ করা।
এখন এমন হল রবীন্দ্রনাথ শ্রীশবাবুর যে বইয়ের সমালোচনা করলেন তা পড়ার জন্যে আপনি আকুতি প্রকাশ করছেন। বইটি একেবারে আত্মস্থ করেছেন তিনি। আপনার পড়ে কেমন লাগবে জানাবেন।
মু. জা. আ.
৩১শে বৈশাখ, ১৪২৬


