৩০শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৫ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৯শে জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

প্রণতি হে প্রাণভূমি

আকাবিরের পদচিহ্নের খোঁজে—৫

প্রণতি হে প্রাণভূমি

মুফতী আবদুস সালাম

হারুন রেস্ট হাউজে কাফি রেস্ট নিয়ে পড়ন্ত বিকেলে দারুল উলূম দেওবন্দ চত্বরে হেঁটে বেড়াই। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভিজতে মন্দ লাগছে না। আজমি মঞ্জিল পার হয়ে আফ্রিকি মনজিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াই, এই পথ এই মাটির গন্ধ, এই মেঘ গলা বৃষ্টি এই ছাত্রাবাস এদের সাথে আমার যেন কত কালের পরিচয়।

ধীর পায়ে মাকবারায়ে কাসেমির দিকে এগিয়ে চলি। ছোট্ট গেট পার হয়ে ভেতরে প্রবেশ করা মাত্রই শিহরণ দোলা দিয়ে যায় আমার বুকে, আমার অস্তিত্বে। শান্ত নিবিড় ছায়ঘেরা কি মায়াময় এই মাটির ডালিখানি। শান্তির এক অশরীর প্রাণভূমি এই মাযার। কেউ যদি আমাকে এখানে এক টুকরো জায়গা করে দিতো জীবন্ত এই গোড়স্তানে!

এই তো বানিয়ে দেওবন্দ হুজ্জাতুল ইসলাম কাসেম নানুতবী, ঘুমিয়ে আছেন বিপ্লবী এই বিদ্রোহী রণক্লান্ত। কত নির্ঘুম রাত কাটিয়ে, উম্মতের জন্য সবটুকু উৎসর্গ করে তবে এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন এই ডালিম গাছের তলে। হিমালয় থেকে আমাজন সিন্ধু থেকে আটলান্টিকের সভ্যতাজুড়ে মিশে আছে তার নামের একটি অংশ।

পাশেই শুয়ে আছেন দৌহিত্র কারি তৈয়ব রহ. দারুল উলুম দেওবন্দের সর্ব কনিষ্ঠ ও সবচেয়ে দীর্ঘকালের মুহতামিম। বইয়ে পড়েছি কত কোমল মধুর প্রেমময় ছিলেন তিনি। আজ তাঁর কবরের সামনে আমি দণ্ডায়মান। এই অনুভূতি আমি কিভাবে লিখি?

ঐতো শাইখুল হিন্দ ঘুমিয়ে আছেন, চির স্বাধীনতাকামী এই মানুষটি এখন নির্মল স্বাধীন ভারতের মুক্ত বাতাসে শান্তিময় শ্বাস নিচ্ছেন। ভারতের স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেননি তাতে কি? পাশেই তো আছেন প্রিয় শিষ্য হুসাইন আহমাদ, ভারত স্বাধীন হওয়ার সংবাদ তো শুনে নিয়েছেন তাঁর কাছ থেকে। ‘হুসাইন ওহী হামারা ওয়াতন হ্যাঁয়’ মালটা কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে এই বাক্যটি বলে ইংরেজ মুক্ত ভারতের স্বপ্ন তো তিনিই তাঁকে দেখিয়েছেন। হে শাইখুল হিন্দ, হে ভারত ভাগ্য বিধাতা! আপনার ভারত আজ স্বাধীন।

পাঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ/ বিন্ধ্য হিমাচল যমুনা গঙ্গা উচ্ছল জলধিতরঙ্গ/তব শুভ নামে জাগে/ তব শুভ আশিষ মাগে/গাহে তব জয়গাথা জনগণমঙ্গলদায়ক জয় হে ভারত ভাগ্যবিধাতা!

‘আসসালামু আলিকা ইয়া হাফিদা খাইরিল ওয়ারা’ মাদানী রহ. এর কবরের সামনে এসে সালাম পেশ করলাম, রাসূলে আরাবীর কদম মুবারকে সালাম পেশ করার সেই যোগ্যতা কোথায়, রসূলে পাকের এই দৌহিত্রের সামনে এসে এই নাযরানা পেশ করাই সৌভাগ্যের আমার।

হযরত মাদানী রহ. এর আমলে দারুল উলুম দেওবন্দ তার স্বর্ণযুগ অতিবাহিত করেছে, দারুল উলুমের দারোয়ান চাচা পর্যন্ত আল্লাহ ওয়ালা ছিলেন বলে যেই কিংবদন্তি শুনা যায় তা হযরত মাদানীর আমলেই ছিলো। ইলম আমল দাওয়াত তাযকিয়ায় যুগের সবাইকে ছাড়িয়ে আকাশের তারায় মিশে যাওয়া এই মহিরুহুর পাশেই শুয়ে আছেন পুত্র ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়েদ আস’আদ মাদানী রহ. এই উম্মতের জন্য তাঁর যে কুরবানী, যেই দান তার নযীর পুরো মুসলিম বিশ্বে নেই।

এখানে এই নিভৃত পল্লীতে ঘুমিয়ে আছেন খুরশেদ আলম কাসেমী, ইবরাহীম বালিয়াভী, ওয়াহীদুজ্জামান কিরানভী, হযরত মারগুবুর রহমান, রিয়াসাত আলী বিজনৌরি রহ.। মহান এই আকবিরদের কবর মাযারে এসে ঝড় বয়ে গেলো আমার বুকের ভেতর। এইসব মনিষীদের ইলম, আমল, তাকওয়া, তাছনিফ, তাহরিকের কথা ভেবে ভেবে কৃতজ্ঞায় বিনত হয়ে যাই। এরাই আমাদের আকাবির, আমাদের পূর্বসূরী। আমাদের ভালোবাসার স্তম্ভ। স্মৃতির মিনার।

ঝিরঝির বৃষ্টিতে আমি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছি মাকবারায়ে কাসেমিতে, ভাবে তন্ময় হয়ে অজানা এক মায়ায় জড়িয়ে আছি এই মৃত্তিকায়। ইচ্ছে হয় হাজার বছর এভাবে ভিজে যাই, এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেটে যাক শতাব্দি।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, পাখির কলকাকলিতে মুখরিত এই গোড়স্তান। মসজিদে রশিদ থেকে মাগরিবের আযান ভেসে আসছে। চারিদিক থেকে ছাত্ররা মসজিদে রশিদের দিকে যায়, সে এক অপূর্ব দৃশ্য।

দারুল উলূমে বাংলাদেশী ছাত্রদের কষ্টের কথা লিখে শেষ করা যাবে না। কত প্রতিবন্ধকতা, বাধা বিঘ্নতা আর প্রাণের হুমকি নিয়ে তারা পাড়ি জমায় এই দেওবন্দে। এখানে এসেও পরিচয়টুকু গোপন করে থাকতে হয়৷ বাংলাদেশ শব্দ উচ্চারণ করতে হয় অনেক সাবধানে। বিহারের ছাত্ররা শুনতে পারলে আর রক্ষে নেই। বাংলাদেশীদের সাথে হিংসা ছাড়া অন্য কোন কিছুতে তারা কুলাতে পারে না।

হাবিবুল্লাহর কল্যাণে বাংলাদেশী ছাত্রদের বেশ বেশ কদরদানী লাভ করলাম। হাবিবুল্লাহ আর চাঁদপুরের আরেক ছেলে মিলে রুই মাছ রেধেঁছে। রুই মাছের মাথা দিয়ে ভাত খাওয়া হবে। সাদা ভাত দেখে আমার চোখ চকচক করে উঠলো। পেট ভরে ভাত খেলাম। খাওয়া শেষে ফিরে গেলাম হারুন রেস্ট হাউজে।

লেখক : শিক্ষক ও পরিভ্রাজক

পড়ুন অন্য পর্বগুলো

আকাবিরের পদচিহ্নের খোঁজে- ১

আকাবিরের পদচিহ্নের খোঁজে- ২

আকাবিরের পদচিহ্নের খোঁজে—৩

‘সাদিয়ানী ফিৎনা’র মারকাযে

প্রণতি হে প্রাণভূমি

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com