২২শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ২০শে শাওয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

রুহানি আবহে কাটলো ইজতেমার প্রথম দিন

ইয়াছিন নিজামী ইয়ামিন : শীতের প্রকোপ কেটে গেছে অনেক আগেই। বিদায় নিয়েছে কুয়াশাও। এখন শীতের প্রকোপ থেকে গরম প্রতাপের আধিক্য। ফ্যান ছেড়ে পাতলা একটা কম্বল গায়ে জড়িয়ে ঘুমাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু ভেতরে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছিল। তাই পারলাম না! কেননা রাতের আঁধার হনন করে প্রভাত-রবি ফুটলেই আমার যাত্রা শুরু হবে ইসলাহী ইজতিমার উদ্দেশ্যে।

অনেক জল্পনা-কল্পনা করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম। ফজরের আযান কানে আসতেই জেগে উঠলাম। আগেরদিন সফরের পাথেয় গুছিয়ে রাখার কারণে খুব বেশি প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। গেঞ্জি আর টাওয়েলটা ব্যাগে ভরেই বেরিয়ে পড়লাম।

ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল থানার ইছাপশর-বেলঙ্কার পথের দূরত্বটা চার-পাঁচ ঘণ্টার। পথের দূরত্ব যতই কমছিল, ততই ভেতরে জমে থাকা আবেগ-ভালোবাসার অনুভূতিটা টের পাচ্ছিলাম। তাড়াইলের সীমায় যখন প্রবেশ করছিলাম, তখন চারদিক থেকে জুমার বয়ান কানে আসছিল। ভেতর থেকে তাড়া অনুভব করছিলাম।কেননা এই জুমার বয়ান দিয়েই ইসলাহী ইজতিমার সূচনা হবে। বেলঙ্কায় আসতেই চকিত হলাম বিখ্যাত আলেমেদ্বীন, অবিসংবাদিত বুজুর্গ, শাইখুল হাদিস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা.বা. এর বয়ানের আওয়াজে। মঞ্চে আসতে আসতে শুনলাম, তিনি বলছিলেন, শয়তান বড় পাজি…।

ব্যাগটা মাদ্রাসার অফিসে রেখেই মঞ্চে উঠেই অবাক হলাম! ইজতিমা শুরু হওয়ার আগেই প্রায় পূর্ণমাঠ লোকে-লোকারণ্য। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে আলোচনা।এ যেন আল্লাহর রাসূল সা. এর সেই কথার জীবন্ত উপমা, ‘নিশ্চয় কিছু বক্তব্য জাদু’। সাক্ষাৎ করলাম শাইখের সাথে। স্মিত-হেসে কুশল বিনিময় করলেন। আদর জানালেন। এরপর জুমা আদায় করলাম হযরতের পেছনে। কতদিন অপেক্ষার পর আজ তার পেছনে নামাজ পড়লাম। তাও ভুলে গেছি। জুমার নামাজের আনুষ্ঠানিকতা যতক্ষণে সম্পন্ন হল, ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা তিনটা ছুঁই-ছুঁই করছে। তাই দুপুরের খাবার, বিশ্রাম আর ব্যক্তিগত কাজের সুযোগ দেওয়া হল আসর পর্যন্ত।
এই ফাঁকে ঘুরে দেখলাম ইজতিমা মাঠের আশপাশটা। মাঠের তিন-চারকোণায় হাত ধোয়ার ব্যবস্থা। পর্যাপ্ত শৌচাগার ও গোসলের ব্যবস্থা। বিশাল পুকুর ঘিরে ঘাটলা বাধানো। আছে ফ্রী মেডিকেল সেবা ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস এবং ফ্রী মাস্কের ব্যবস্থা। ইংল্যান্ডের আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে চলছে অনেক সেবামূলক কার্যক্রম। খাবারের পানি সহ আরো অনেককিছুই সরবারাহ করছে তারা। পুরো ইজতিমাকে সরাসরি সম্প্রচার করছে ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ‘ইকরা টিভি ইউকে’। আর মানুষের কোলাহলে মুখরিত হয়ে আছে ইজতিমা মাঠের চারপাশ।

আসরের পর থেকে আবার আমল শুরু হল। তালিম আর মুনাজাতে কাটলো মাগরিব। মাগরিবের পর ছয় তাসবিহের আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠলো চৌদিক। যা ধ্বনি-প্রতিধ্বনি হয়ে আঘাত করে নিস্তেজ ভগ্নহৃদয়কে, কলবকে করে উদ্বেলিত আর দেহে প্রাণ সঞ্চার করে। এরপর বয়ান করলেন আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা.বা. এর জামাতা, চরমোনাই তৃতীয় পীরসাহেব, হযরত মাওলানা নূরুল করীম দা.বা.। যখন বয়ান শেষ হল, তখন মনে হলো এতক্ষণ বসে থাকা কাঠমূর্তিগুলো নড়ে উঠলো। তখনও কারো বয়ানের রেশ কাটেনি। এরপর হযরত মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাইফী, মাওলানা হোসাইন সাহেবসহ আরো দেশ-বরেণ্য বিজ্ঞ আলেমেদ্বীন তাঁদের বয়ানের বাঁধনে বেধে রেখেছিলেন এশার সালাত পর্যন্ত।

এশার সালাতের পর জামিয়া ইকরা বাংলাদেশের মুহাদ্দিস মাওলানা শফিকুল ইসলাম সাহেব হুজুর দুরুদের খতম পড়লেন। মজলিসের সকলেই তন্ময় হয়ে শুনলেন দুরুদের মায়াবী আর গভীর মমতার সুর। অনুভবমেয় হয়ে উঠলো সকলের কাছে। এরপর হজরতুল আল্লাম মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা.বা. কিছুক্ষণ তালিম করলেন। তালিমের পর দুআ। দুআটাই এখানে মুখ্য বিষয়। ‘আদ-দু’আয়ুল মুখখুল ইবাদাহ্’। এত আবেগ আর এত কাতরতা! আর কোথায় পাওয়া যাবে এগুলো! জীবনের সকল পাপ-পঙ্কিলতা মুছে যায় মূহুর্তেই। পবিত্র আবহে পূর্ণ হয়ে উঠে হৃদয়-আত্মা। সেই পবিত্রতা গায়ে মাখিয়েই বিছানায় গেলাম রাত্রিযাপনের উদ্দেশ্যে…।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com