অলস দিনে দারুল উলূমে

অলস দিনে দারুল উলূমে

আকাবিরের পদচিহ্নের খোঁজে—৬

অলস দিনে দারুল উলূমে

—মুফতী আবদুস সালাম

হোটেলের ছাদ থেকে দারুল উলুমের পুরো চিত্র একসাথে দেখা যায়। সূর্যের নরম রোদে রূপসী হয়ে উঠেছে কদীম মসজিদের রক্তিম গম্বুজগুলো। প্রভাত সমিরণে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে রুমে ফিরে এলাম। এই অলস সকালে হোটেলের নরম বিছানা ছেড়ে বাইরে বেরোতে কার ইচ্ছে করে? তবুও হাবিবুল্লাহর জবরদস্তিতে বের না হয়ে থাকা গেলো না।

এ কয়দিনে মহিষের সাথে ভালোই মানিয়ে গেছি। মানে মহিষের গোশতের সাথে। মাটির টংএ বসে আছি৷ হাফ প্লেটে করে মহিষের তেহারি এগিয়ে দিয়ে বুড়ো দোকানি বলল—খাইয়ে মাওলানা বহুত আচ্চা বিরিয়ানি হ্যাঁয়, বহুত উলেমা ইহা পে বেইট কর খাতে হ্যাঁয়’। তেলে ডুবা বাঁশমতি চালে মহিষের মাংসকুচি, উপরে ছিটানো লং এলাচি দারুচিনি সব মিলিয়ে চাচার আচ্চা বিরিয়ানি।

‘কেয়সা লাগা’? খাওয়া শেষে বৃদ্ধ চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করলো। তার চোখ ঝলমল করছে৷ কিছু মানুষ আছে অন্যকে খাইয়ে আনন্দ পায়, উনি সেই গোত্রের।

‘বহুত আচ্চা’ বলার পর উনার আনন্দ আরো বেড়ে গেলো৷ জীবনে দুইজনকে দেখেছি রান্নার প্রশংসা করলে খুশি হয়; একজন ইকরার মাওলানা ইসহাক দ্বিতীয়জন দেওবন্দের এই বৃদ্ধ। তাছাড়া রান্নার প্রশংসা করলে নিজের বউ পর্যন্ত ধরে নেয় কটাক্ষ করছি।

কয়েক কদম সামনেই ছাত্তা মসজিদ। ছাত্তা মসজিদ আছে কিন্তু সেই ডালিম গাছটি আর নেই। তথ্যবই হাবিবুল্লাহ জানালো কয়েক বছর আগে রাতের আঁধারে কে বা কারা যেন কেটে ফেলেছে।ছাত্তায় দু’রাকাঅাত নামাজ পড়ে বেরিয়ে এলাম।

এখানকার লাইব্রেরীগুলো ঘুরে তরুণ আলেমদের সৃষ্টিশীলতা দেখে আমাদের দেশের বাজারি অনুবাদকদের মেধার স্থবিরতা সহজেই অনুমান করা যায়। রুটিরুজির জন্য কাজ করা আর মেধার স্বাক্ষর রেখে মৌলিক কিছু করার মাঝে আসমান জমিন ফারাক।

স্বভাবতই আমার চোখ খুঁজছিলো আরবী সাহিত্যের কিতাব। এখানে আদবের কিতাবের সংগ্রহ খুবই কম৷ এমনকি নদওয়ায় গিয়েও আদবের তেমন কোন সংগ্রহ দেখিনি।

ভাই উসামার লাইব্রেরিতে এসে আদবের কিছু কিতাব সন্ধ্যান মিললো যা কিনা ‘পিতাজি’র লেখা। উনি বারবার পিতাজি পিতাজি বলে কাকে বুঝাচ্ছেন আন্দাজ করা গেলো না। আবার জিজ্ঞেস করাও যাচ্ছে না। একবার ভাবলাম জিজ্ঞেস করি পিতাজি কোন হ্যাঁয়? কিন্তু লজ্জায় পড়ে আর জিজ্ঞেস করা হলো না। কৌশলে বললাম, ‘পিতাজি কি কুই নয়া কিতাব দেখাইয়ে না’। ভাই উসামা যখন ‘ফিলিস্তিন ফি ইনতিজারি সালাহুদ্দীন’ কিতাবটি বের করলেন তখন আর বুঝতে বাকি রইলো না নূরে আলম খলীল আমিনিই হচ্ছেন উনার সেই বিখ্যাত পিতাজি।

দেওবন্দের উস্তাদদের মধ্যে একমাত্র উনিই বাংলাদেশ সফর করেননি। আর একজন আছেন আব্দুল খালেক মাদরাজি। উনাকে কেউ বাংলাদেশে আসার দাওয়াত দিলে উনি সাফ সাফ বলে দেন, মুঝ কো হাদিয়া কি জরুরত নেহী। বাংলাদেশে যে ইতোমধ্যে দারুল উলুমের উস্তাদদের নিয়ে বেশ রমরমা বাণিজ্য চলছে সম্ভবত উনি টের পেয়েছেন।

ভাই উসামা জানালেন, কদীম মসজিদের দোতলায় পিতাজি জুমু’আর নামাজ পড়েন। আযানের আগেই চলে আসেন।পিতাজিকে পাওয়া গেলো। দুইপাশে দুই খাদেম ঝুলে ঝুলে কুরআন তেলাওয়াত করছে আর উনি নামাজ পড়ছেন। নামাজ শেষে হালকা সাক্ষাৎ করে কেটে পড়লাম।

কাল সন্ধ্যায় আজমল আতরের সামনে একটি চেহারা একঝলক দেখে চেনা চেনা মনে হয়েছিলো, যদি অচেনা কেউ হয় এই ভেবে আর আগ বাড়াইনি।
জুমুআর আগে সেই ছেলেটি কাছে এসে জড়িয়ে ধরে বললো ভাই কেমন আছেন? ইকরায় আমার একবছরের জুনিয়ার। সেই আট বছর আগের ইমরান সিরাজি এখনো আমাকে মনে রেখেছে। দুজনেই বিক্রমপুরের সন্তান। সে হিসেবে একবেলা দাওয়াত তার কাছে প্রাপ্যই ছিলাম আমি।

মসজিদে রশিদে জুম’আর নামাজ পড়লাম। খুতবার আগে মিম্বারে বসে ঝাঁঝালো বয়ান দেওয়ার প্রথা এখানে নেই। খুতবার সময় হলে কেউ একজন আযান দিয়ে দিবে আরেকজন নামায পড়িয়ে চলে যাবে। জুম’আর বয়ান একদেশে যোগ্যতার মানদণ্ড আরেক দেশে গুরুত্বহীন অপ্রতুল বস্তু।

ইতিমধ্যে বেশ কিছু বাংলাদেশী ছাত্রদের সাথে পরিচয় হলো। কুমিল্লা চাঁদপুরের ছাত্রদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশী। তাদের কষ্টের কথা কেউ যদি লিখতো আরেকটি ‘ছফাহাত মিন ছাবরিল উলামা’ রচিত হতো। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পার হওয়ার যে লোমহর্ষক ঘটনা শুনেছি তা লিখতে গেলে হাজার পৃষ্ঠা ফুরিয়ে যাবে।

দেওবন্দ এসেও তাদেরকে পোহাতে হয় নানান ভোগান্তি। পুলিশের ভয়ে তটস্থ থাকতে হয় রাত দিন। দাখেলায় সবচেয়ে ভালো নাম্বার পেয়েও বাংলাদেশী হওয়ায় তাদের কপাল পুড়ে যায়। তবু দেওবন্দ পড়ার তীব্র পিপাসা যেন তাদের মিটে না।

তাদের জন্য নিরাপদ সুন্দর ব্যবস্থা করে দেওয়ার কি কেউ নেই?

এক মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা.বা. কয়টা করবেন? তবুও তিনি বসে নেই। চেষ্টা করে যাচ্ছেন, গতবার ইন্ডিয়ান রাষ্ট্রদূত শ্রিংলার সাথে বাংলাদেশী ছাত্রদের দেওবন্দ যাওয়ার জন্য স্টুডেন্ট ভিসা চালু করার প্রস্তাব দেন। এখনো তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। এই সরকার তো হুজুরদেরই সরকার৷ নিজের অধিকারের সাথে সাথে জাতীর জন্য সুবিধাটা আদায় করা যায় না?

ভাই কোথায়? যখন ইমরান সিরাজির ফোন পেলাম তখন আমি মহেষ বাবুর দোকানে কেনাকাটা করি। মহেষের বাবু একজন ক্যারিশমেটিক মানুষ। আপনি যদি এক হাজার টাকার সদাই করতে যান তবে সে আপনাকে নরম গলায় দশ হাজার টাকার মাল গছিয়ে দিবে। এবং আপনিও তা নিয়ে খুশি মনে বাড়ি ফিরবেন।

প্রথমে বেশী দামের মাল দেখাবে যখন কিনে ফেলবেন তখন সেইম জিনিসটিই আগেরটার চেয়ে কম দামের মধ্যে দেখাবে, যখন সেটাও কিনবেন আরেকটু কমের ভেতর বের করবে। তিনটি চাদর তিনটি শাড়ি তিন ধরণের পাঞ্জাবির কাপড় কিনেছি।

বিদেশে গেলে হাতে অতিরিক্ত পাঁচ হাজার টাকা রেখে খরচ করতে হয়। পাঁচ হাজার রূপি আলাদা রেখে অতিরিক্ত পয়সা হিসেবে মানিব্যাগের চিপায় যেই একশ ডলারের নোটটি ছিলো তাই কাজে লাগালাম।

মুরগীর ঝোল, ডিমের দেশীয় ভুনা, আর টকদই দিয়ে সালাদ বানিয়েছেন ইমরান সিরাজি। দেওবন্দ এসে কেতাদুরস্ত রাধুনী বনে গেছেন। ‘ভাই ইমরান নে মুঝ কো ভাত খানা সিখায়া’ খেতে খেতে বিহারি ছেলেটে বললো। বাংলাদেশীদের সাথে বিহারিদের সাপে নেউলে সম্পর্ক। কিন্তু একে ইমরান সিরাজি বশে এনেছেন। এখন সে ইমরান সিরাজির একনিষ্ঠ ভক্ত ও খাদেম। আমি যখন এই এই লেখাটি লেখি তখন ইমরান সিরাজি ভাই বাংলাদেশে। তার আন্তরিকতার কথা মনে রাখার মত৷

বাংলাদেশী আরো কয়েকজনের সাথে দেখা, তকী ভাই, ইহসান ভাই, শরিফ ভাই, ইয়াসিন ভাই। ক্ষণিকের পরিচয়ে এরা খুব আপন করে নিয়েছিলো আমাকে। এদেরকে আমার মনে রাখা উচিত।

লেখক : শিক্ষক ও পরিভ্রাজক

পড়ুন অন্য পর্বগুলো

আকাবিরের পদচিহ্নের খোঁজে- ১

আকাবিরের পদচিহ্নের খোঁজে- ২

আকাবিরের পদচিহ্নের খোঁজে—৩

‘সাদিয়ানী ফিৎনা’র মারকাযে

প্রণতি হে প্রাণভূমি

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *