আমার কওমি অঙ্গন রাতারাতি কী হয়ে গেল?

আমার কওমি অঙ্গন রাতারাতি কী হয়ে গেল?

মুহাম্মাদ আইয়ুব : আমার ফযিলত ২য় বর্ষের (মেশকাত) কথা (২০১৫)। ফজরের নামাজ জামাতে পড়তে পারিনি, গোসল করে রুমেই পড়ে নিয়েছি। হঠাৎ রুমে উপস্থিত দারুল ইকামার জিম্মাদার মাওলানা ইদ্রিস সাহেব। গুরুগম্ভীর গলায় বললেন, মসজিদে যাস নাই ক্যান? চূড়ান্ত আদব বিনয় ও ভদ্রতা মিশ্রিত গলায় সবিনয়ে আরয করলাম, হুজুর সমস্যা হয়েছিল। ঠাস ঠাস করে দুটি থাপ্পড় কষে দিলেন। আমি মাথা নিচু করে রাখলাম উঁচু করার দুঃসাহসের মারণকল্পনা করলাম না। মাথা উঠিয়ে চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকা সেকালে বেয়াদবি বলে গন্য হত।

বছর পাঁচেক পরে শিক্ষক হয়ে আসলাম মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী জামিয়া আল হাসানাইনে। আমি তখন দারুল ইক্বামার জিম্মাদার। নাহবেমীর পড়ুয়া এক ছাত্রের মোবাইল ধরা পড়ল আমার কাছে। আমি উপর থেকে নিচে আমার কামরায় আসতে না আসতেই সেই ছাত্র মহোদয় সামনে হাজির। মোবাইল দ্যান…! আমি এই মাদ্রাসায় আর পড়ুম না! আসমান থেকে পড়লেও বোধহয় অতটা আহত হতাম না যতটা আহত হয়েছি আমার এই ছাত্রের কথা শুনে। আহ! আমার কওমি অঙ্গন রাতারাতি কী হয়ে গেল?

যেই বেয়াদবিকে কওমী মাদ্রাসায় আক্ববাহুল ক্বাবায়েহ ধরা হত সেটাই আজ কওমি অঙ্গনে সংস্কৃতি বলে বিবেচ্য। শায়খুল ইসলাম মাদানী রহ. এর অন্যতম খলীফা আল্লামা শাহ আহমাদ শফী রহ. এর সাথে যে ন্যাক্কারজনক ঘটনা কওমীর লেবাসধারীরা ঘটিয়েছ তা এক কথায় ভয়াবহ। প্রবীণরা যখন একে অন্যের দিকে ভরা মজলিসে নাবালকদের সামনে বলে ‘ঠ্যাঙ ভাঙি ফেলবো’ তখন তো বাচ্চারা এটাকে ছোয়াবই মনে করবে। আর যা হবার তা-ই হচ্ছে।

কওমী মাদ্রাসার এ দুর্দিনে শায়খুল ইসলাম মাওলানা তাকী উসমানী সাহেব বড় সুন্দর কথা বলছেন, ‘ছাত্র উস্তাদের মধ্যে রুহানিয়াত নেই। শুধু ক্ষমতা আর প্রতি হিংসার আগুন জলছে শিক্ষক তলাবাদের মধ্যে। অনেক চিন্তা ভাবনা করার পর যতোটুকু আমি বুঝতে পারলাম তা হল; কওমি মাদ্রাসার অধঃপতনের মূল কারণ হলো আস্তে আস্তে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থাটা গতানুগতিক একটি প্রথায় পরিণত হয়েছে। আর এর আসল উদ্দেশ্য আমরা ভুলে গিয়েছি।’

ছাত্ররা শিক্ষকদের থেকে পুঁথিগত শিক্ষা পাওয়ার সাথে সাথে চারিত্রিক শিক্ষাও গ্রহণ করত। তাঁদের থেকে জীবন পরিচালনা করা শিখত।

এমনিভাবে কওমি মাদ্রাসার গৌরবময় ইতিহাসের এক উজ্জল বৈশিষ্ট্য হলো, এখানের শিক্ষক ছাত্রদের পারস্পরিক সম্পর্কটা গতানুগতিক সাধারণ কোন সম্পর্ক নয়, যা শুধু মাত্র শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। বরং এটা পরস্পরের মধ্যে আত্মার পবিত্র সম্পর্ক। যা শিক্ষা জীবন থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত অটুট থাকত। উস্তাদ শুধুমাত্র কিতাব পড়ানোর জন্য নিযুক্ত কোন শিক্ষক ছিল না, বরং নিজ ছাত্রদের জন্য তাঁরা ছিলেন কল্যাণকামী দরদী এক মহান পিতা। ছাত্রদের চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক দিক নির্দেশনা প্রদানকারী। ইলম ও আমলের ময়দানে ছাত্রদের শুভাকাঙ্ক্ষী এক অভিভাবক। সাথে সাথে তাঁরা ছাত্রদের নিজস্ব বিষয়গুলোও দেখাশোনা করতেন। ফলে ছাত্ররা শিক্ষকদের থেকে পুঁথিগত শিক্ষা পাওয়ার সাথে সাথে চারিত্রিক শিক্ষাও গ্রহণ করত। তাঁদের থেকে জীবন পরিচালনা করা শিখত। শিখত ধার্মিকতা, একনিষ্ঠতা, বিনয়-নম্রতাসহ উত্তম চরিত্রের আরো অনেক গুণাবলী। আর এভাবেই ছাত্ররা শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় শিক্ষকদের সাদৃশ্য হয়ে উঠত।

বিশেষ করে ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’ যেই মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশ্বের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এক ভিন্নরকম উচ্চতায় পৌঁছেছে। তা হলো, এটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয় বরং আদর্শ মানুষ গড়ার এক বিশাল কারখানা। যেখানে শিক্ষার চেয়ে দীক্ষার পরিমাণই বেশি থাকে। ফলে তৈরি হয় সঠিক শুদ্ধ আকিদায় বিশ্বাসী একনিষ্ঠ একজন পাক্কা মুসলমান। যারা কথার চেয়ে বেশি নিজেদের সুন্দর আচার-ব্যবহার আর উত্তম চরিত্রের মাধ্যমেই ইসলামের প্রচার-প্রসার করে।

কিন্তু আফসোসের বিষয় হল আস্তে আস্তে এ বিষয় গুলো আদিম যুগের ইতিহাসের মতো হয়ে যাচ্ছে। আর এর মূল কারণ হচ্ছে শিক্ষকরা নিজেদের মূল উদ্দেশ্য এটা কে বানিয়েছেন যে, শ্রেণিকক্ষে এমন ভাবে পড়ানো যাতে ছাত্ররা খুশি হয়ে যায। তাঁরা সব সময় ভাবতে থাকে, পড়ানোর জন্য তাঁদেরকে কেমন প্রবন্ধ বা কিতাব দেওয়া হয়েছে? কিভাবে ছাত্রদের ওপর নিজের জ্ঞানের প্রভাব পড়বে?

কোন পদ্ধতি অবলম্বন করলে ছাত্রদের মাঝে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে? আর এই গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে গিয়ে কোন পদ্ধতিতে পড়ালে ছাত্রদের বেশি উপকার হবে, সেটা ভুলে যায়। বরং কখনো তো তাঁরা খুঁজতে থাকে যে, কোন পদ্ধতিটা ছাত্রদের প্রবৃত্তির চাহিদা অনুযায়ী হবে? ফলে শিক্ষকগণ ছাত্রদেরকে দিক-নির্দেশনা দেওয়ার পরিবর্তে তাদের প্রবৃত্তির অনুগত হয়ে যায়। আর ছাত্ররা শিক্ষকের পিছনে চলে না বরং শিক্ষকরা ছাত্রদের চাহিদার পিছনে দৌড়াতে থাকে।

কিন্তু কিভাবে পড়ালে ছাত্রদের উপকার হবে? কী কী শেখালে ছাত্ররা ধর্ম, দেশ ও জাতির জন্য আরও উপকারী হিসেবে গড়ে উঠবে? ছাত্রদের কী ধরনের আগ্রহ-উদ্দীপনা, চাহিদা তাদের জন্য ক্ষতিকর? কিভাবে ক্ষতিকর জিনিস থেকে তাদের আগ্রহ দূর হবে? শ্রেণীকক্ষের বাইরে তারা কিভাবে চলা ফেরা করছে? এগুলো বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করা, ছাত্রদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য পূরণে এগিয়ে আসার মতো লোকেরাও আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

কওমি মাদ্রাসার এই প্রাণ যা সময়ের ঘূর্ণিপাকে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে, এটাকে পুনর্জীবিত করতে সবচেয়ে বড় গুরুদায়িত্ব হল প্রত্যেকটি মাদ্রাসার শিক্ষক এবং পরিচালনা কমিটির সদস্যের উপর। তাদের উচিত সর্ব প্রথম তারা নিজেদের আমল-আখলাকের দিকে নজর দিবে। তাঁরা দেখবে ইসলামী শিক্ষা তাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন এনেছে কি না?আল্লাহর ভয় আর আখেরাতের চিন্তায় তাদের অন্তর কেঁপে ওঠে কি না? রবের সাথে তাদের নৈকট্য বৃদ্ধি পেয়েছে কি না? ইবাদতের প্রতি তাদের আগ্রহ কতটুকু বৃদ্ধি পেয়েছে?

আমলের যেই ফজিলতগুলো দিনরাত তারা অন্যকে শোনাচ্ছেন, নিজেরা তার উপর কতটুকু আমল করছেন? আল্লাহর রাস্তায় দান সদকা করার জন্য অন্যদেরকে কুরআন হাদীস শুনিয়ে যেই উৎসাহ উদ্দিপনা দেওয়া হয়, নিজেরা তাতে কতটুকু অংশ গ্রহণ করেছে? ইসলামের জন্য জান ও মালের কুরবানী দেওয়ার জন্য কতটুকু প্রস্তুতি নিয়েছে? সমাজের এই অধঃপতনে তারা অস্থির হয়ে ছটফট করছে কি না? সুন্দর সুশীল সমাজ বিনির্মাণের চিন্তা-চেতনা তাদের মন-মস্তিস্কে কতটুকু প্রভাব ফেলেছে? যদি এ বিষয় গুলো নিয়ে আমরা চিন্তা করি, বাস্তবতা আর সততার সাথে নিজেদের মাঝে এগুলোর উত্তর খুঁজি তাহলে লজ্জায় শরমে মাথা নিচু করে আফসোস আর অনুতাপ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।

আরও পড়ুন: হ্যালো ইমাম সাহেব 

তাই এখন সময়ের দাবি, এই আফসোস আর অনুতাপ থেকে শিক্ষা নিয়ে আর লজ্জা-শরমকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ সুন্দর করা। তবে এটা সাময়িক হলে, তাতে কোন উপকার হবে না। বরং সর্বদা এটা মনেপ্রাণে ধারণ করে নিতে হবে, আর নিজেদের ভবিষ্যৎকে চোখের সামনে ভাসিয়ে তুলতে হবে। তাহলেই হয়ত আবার ফিরে যেতে পারি আমাদের হারিয়ে যাওয়া সেই সোনালী অতীতে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের জন্য কবুল করুন।’

এবার ছোট্ট একটি গল্প দিয়ে লেখাটি শেষ করছি। শায়খে মুহতারাম আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব দা.বা. এর সাথে ইসলাহী সফরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে হুজুরকে অনেক প্রশ্নই করলাম। একটা প্রশ্ন করলাম, হুজুর! আমি ফেসবুকে অনেক সময় মামনুল হক্ব সাহেবের কিছু কিছু কাজের সমালোচনা করে তাঁর নাম নিয়ে পোস্ট দিই, তো নাম নিয়ে এভাবে লেখা কি ঠিক হবে?

হুজুর সুস্পষ্টভাবে বললেন, না ঠিক হবে না।এমনকি কোন আলেমের ইজ্জত নষ্ট হয় এমন কোন কিছু করা ঠিক নয়। কি দারুণ শিক্ষা সুবহানাল্লাহ! অনেক বড় শিক্ষা পেয়ে গেলাম মহান গুরুর কাছ থেকে। আহ! সকল গুরুরাই যদি এমন উদার ও মহান হতেন।

লেখক : খতিব, শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *