আকাবিরের পদচিহ্নের খোঁজে —৭
আবার আসিবো ফিরে দারুল উলূম দেওবন্দ
—মুফতী আবদুস সালাম
রিসিপশনে বসা যুবক ভ্রু টানটান করে বললো, ইতনি জলদি চল রাহা হ্যাঁয়? এই যুবক আর তার রাগী চেহারার বাবার প্রতি আমাদের বিশেষ ক্ষোভ আছে। কাজেই তার কথার উত্তর দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। এয়ারপোর্টের হয়রানি থেকে বাঁচার জন্য হোটেলের রিসিট নিয়ে খুব ভালো করেছি৷ চেক আউটের রেজিস্টারে সাইন করে সোজা বেরিয়ে পড়লাম।
আজ সন্ধ্যায় দারুল উলুম দেওবন্দকে বিদায় জানাতে হবে অথচ আকবিরের স্মৃতিধন্য পঞ্চভূমি; নানুতা, জালালাবাদ, থানা ভবন, গংগুহ, সাহারানপুর কোনটিতেই যেতে পারিনি। আর কয়েকটা দিন সময় নিয়ে আসা ভালো ছিলো।
আমার এই সফর ছিলো অনেকটা ঠেকায় পড়ে করা। ভিসার মেয়াদ মাত্র একমাস বাকি , দিন পনেরো পরে মাদরাসার বার্ষিক পরীক্ষা। পরীক্ষা কমিটির আমি আবার সম্মানিত সদস্য। এখনই ইন্ডিয়া না গেলে সামনে যাওয়ার আর সুযোগ নেই, গেলেও দশদিনের বেশী থাকা সম্ভব না। তাই দুইয়ে দুইয়ে বাইশ মিলিয়ে এই অফসিজনে একা একা ইন্ডিয়া ঘুরতে এসেছিলাম। শীতকালের সূর্যের মতো ঢুঁ মেরেই উধাও হতে হয়েছে সব জায়গায়। এতো কাছে এসেও আকাবিরের স্মৃতিধন্য মাওয়াজেয়ে খমসা না দেখে চলে যাওয়ার অনুভূতি খুবই কষ্টের।
দারুল উলূমের উস্তাদদের সাথে সাক্ষাত না করতে পেরে ক্ষানিক অপরাধ বোধ করছি। অপরিচিত বিশেষ ব্যক্তিদের সাক্ষাত করতে ভারী সংকোচ বোধ করি আমি। জুতা পায়ে প্রবেশ নিষেধ এমন কোন স্থানে জুতা নিয়ে ঢুকলে যেমন অনুভূতি হয় অপরিচিত প্রসিদ্ধ কোন আলেমের সামনে দাঁড়াতেও ঠিক তেমন লাগে। মোবাইলে অপরিচিত কোন নাম্বার থেকে ফোন এলেও অস্বস্তি বোধ করি আমি। আমার কি কোন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো উচিত? এই সমস্যার কারণে আমি অনেক আলেম উলামার সংস্রব থেকে বঞ্চিত হয়েছি। ইকরায় সারাবছর মধ্যপ্রাচ্য ও দেওবন্দী উলামায়ে কেরামের আগমনে সরগরম থাকে; স্বভাবতই এই সমস্যার কারণে তাদের সামনে যেতে পারি না।
সে যাই হোক, ইমরান সিরাজীর কল্যাণে দারুল উলূমের কিসমুল আদাবের উস্তাদ সালমান বিজনৌরির সাথে সাক্ষাৎ ও দুপুরের খাবারের নেমন্তন্ন পেলাম।
হোটেল থেকে বের হয়ে লাগেজ আফ্রিকী মঞ্জিলের শরিফ ভাইয়ের রুমে রেখে এলাম নেমন্তন্ন খেতে। দারুল উলূমের উস্তাদের অতিথি হতে পারা আমার সাত জনমের ভাগ্য।
বিজনৌরি সাহেব নকশবন্দিয়া সিলসিলার পীর।এই তরীকার লোকজন বেশ গুরুগম্ভীর হয়ে থাকেন৷ ভারিক্কি চালে দীর্ঘ বিরতি নিয়ে কথা বলেন। আমার আল কাওয়াকিবুল আশারা তিনি খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে ছোট্ট একটি মন্তব্য করলেন যা আমার বড় অবলম্বন হয়ে থাকবে।
উলামায়ে দেওবন্দের মধ্যে ছাহাবায়ে কেরামের যেই গুণটি আমি পূর্ণ মাত্রায় দেখেছি তা হলো বে তাকাল্লুফী ভাব। খাওয়ার সময় বিজনৌরি সাহেবের অনাড়ম্বরতায় আমি মুগ্ধ হলাম। খাবারের বিবরণ দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না। তেহারী, মহিষের কালো ভূনা, চাপাতি, খাসির পায়া, টক দইয়ের সালাত, গাজরের হালুয়া। রান্নার স্বাদ ছিলো অসাধারণ। সব কিছু নিজে উঠিয়ে দিচ্ছিলেন হযরত বিজনৌরি। বিদায় জানাতে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এলেন।
মসজিদে কদীমে নামাজ পড়ে দারুল উলূমকে শেষ বারের মত দেখতে বেরোলাম। সঙ্গে আছেন তকী ভাই আর ইমরান সিরাজী৷ তকী ভাই উলুমুল হাদীসের ছাত্র, থাকেন বাবুজ জাহেরের উপরে ছোট্ট এক কুঠুরিতে। আমাকে এক প্রকার জোর করে উপরে নিয়ে গেলেন। ‘কালা আবু দাঊদ’ এর ব্যাখ্যা করে আরবীতে এক কিতাব লিখেছেন তিনি৷
দারুল উলূমে এ কয়জন ছাত্র প্রকৃতপক্ষেই পড়াশুনার জন্য এসেছে তকি ভাই তাদেরই একজন৷ এসব ছাত্র বাংলাদেশে গিয়ে কেন যেন হারিয়ে যায়। তাদের প্রতিভার যথাযথ স্বাক্ষর রাখতে পারে না তারা। সৃষ্টিশীল কাজের হাতছানি ভুলে বাজারি অনুবাদক বনে যায় অনেকে আবার ৷ তাদের গবেষণা সীমাবদ্ধ হয়ে যায় শবে বরাত, তারাবিহ বিশ রাকাত, জোরসে আমীন আস্তে আমীনের বিতর্কে। এসব থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেওয়ার মত কোন কাজ করার সাহস তারা হারিয়ে ফেলে অথবা সমাজ। বাংলাদেশের ইলমি অঙ্গনে এখন যে করাচির দমকা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে এটাই দেওবন্দ ফারেগদের প্রতিভা বিনষ্টের মূল কারণ বলে আমি মনে করি।
হযরত কাসেম নানুতবী স্বপ্নযোগে যেই জায়গাটি রাসূল সা. রেখা টেনে দিয়েছিলেন সেখানে এসে ভেতরে অনাবিল সুখের দোলা দিয়ে গেলো। রাসূল সা. যে কূপ থেকে পানি পান করিয়েছিলেন আকণ্ঠ পান করলাম সেখান থেকে। ঘোরাঘুরি শেষে আফ্রিকি মঞ্জিলে এসে গা এলিয়ে দিলাম।
অটো বাইকে লাগেজ ব্যগেজ উঠানো হচ্ছে, রুমের সামনে অনায়াসে অটো আসতে পারে। আফ্রিকি মনজিলের সামনের এই বিস্তৃত আঙ্গিনাজুড়ে মটর সাইকেল দাপিয়ে বেড়ায় ছাত্ররা। মাঝে মধ্যে রেস বেঁধে যায় বিভিন্ন প্রদেশের ছাত্রদের মাঝে। জীবনের ভেতর এই দারুল উলুমে গড়ে উঠে তাদের ভিন্ন আরেকটি জীবন।
লাগেজ নিয়ে মহা টেনশনে আছি। বিশ কেজির বেশি হয়ে গেলে এয়ারপোর্টেই রেখে যেতে হবে, বাক্স, কাগজ, প্যাকেট সব ফেলে দিয়েছি৷ তারপরও ভয় হচ্ছে বিশ কেজির বেশী হয়ে যায় কিনা।
অলিগলি বেয়ে অবশেষে পৌঁছা গেলো দেওবন্দ স্টেশনে৷ নওচান্দী এক্সপ্রেস আসতে ঘণ্টা খানেক লেগে গেলো। গন্তব্য লাখনৌ। পাঁচশ কিলোমিটারের পথ পারি দিতে হবে। হুইসেল বাজিয়ে নড়েচড়ে উঠলো ট্রেন। বিদায় দেওবন্দ।


