আকাবিরের পদচিহ্নের খোঁজে—৮
জ্যোতির্ময় আঙিনায়
—মুফতী আবদুস সালাম
‘মাওলানা ছাব, কাহা যানা?’ খাকি উর্দি পরা অটোবাইক চালকের মুখে অমন নবাবী চালের উর্দু শুনে ঘুমে ঢুলুঢুলু আমি সম্বিত ফিরে পেলাম। রাতজাগা ক্লান্ত দেহখানা কসরত করে অটোর ভেতের সেধিয়ে দিয়ে বললাম ‘নদওয়া কালেজ যানা’। নদওয়াতুল উলামাকে এখানকার আম লোকে চিনে না, তারা চিনে নদওয়া কলেজকে। নদওয়া কলেজ না বলে যদি বলেন নদওয়াতুল উলামা যাবো তাহলে আপনার আর সেখানে যাওয়া হবে না। সারাদিন এই চারবাগ স্টেশনে বসে বসে আপনাকে ট্রেনের বগি গুনতে হবে। তবে এই চারবাগ স্টেশন ইন্ডিয়ার নজরকাড়া একটি রেল জংশন। যদিও আমার ঘুরে দেখার ভাগ্য হয়নি।
নদোয়ার গেইটে ঢুকতেই ভারতের পাইলট অভিনন্দনের মত মুচওয়ালা এক গার্ড তার হিমালয়ের মত উঁচু উদর নিয়ে পথ আটকে দাঁড়ালো। কোন হলে কত নাম্বার রুমে যাবো নানান প্রশ্ন জুড়ে দিলো। শেষে সাইদ ছুটে এসে আমাদেরকে উদ্ধার করলেন। পনের বছর পর সাইদের সাথে দেখা। মাঝখানে কোথার পানি কোথায় গড়িয়ে গেছে, তার ভগ্নি আমার প্রণয়বিধুরা হয়েছে। রাড়ীখাল মাদরাসার সেদিনের সে একরত্তি ছেলেটা এখন সাইদ আহমাদ নদবী হয়েছে। তাই কোলাকুলিটা উষ্ণ হওয়াটাই উচিৎ ছিলো।
চোখজোড়া লেগে আসতে না আসতেই ডাক এলো, নদোয়ার উস্তাদদের সাথে সাক্ষাতের সুবর্ণ সুযোগ চলে যাচ্ছে। ভালো বিড়ম্বনায় পড়া গেলো দেখি। দেওবন্দে কোন রকম পার পেয়ে গেছি এখানে এসে বুঝি রক্ষে নেই। বড় মানুষদের সামনে যেতে আমার ভারী সংকোচ বোধ হয়। হাত ঘেমে যায়, গলা শুকিয়ে আসে। নিজেকে খাঁচার ভেতর বন্দী প্রাণীর মত অসহায় মনে হয়।
মুফতি যায়েদ মাজহারির অনর্গল ওয়াজ শুনতে হচ্ছে৷ এই কিতাব লিখে জাতিকে কি উদ্ধার করে ফেলা হয়েছে? হাওয়ালা টাওয়ালা ছাড়া এ কোন আজব কিতাব? উম্মতের কি কাজে আসবে এটি? টাইপ নানান প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। আমি হা করে কেবল শুনেই যাচ্ছি। শেষ প্রশ্নটা ছিলো এমন ‘মাওলানা আব্দুল মালেক কে সাথ তা’আল্লুক হ্যাঁয়? আমি অতি সংক্ষেপে ছোট বেলার ‘ইয়েস অর নো’র জবাবের মত করে এক শব্দে উত্তর দিলাম ‘নেহি’। উনি চশমার উপর দিয়ে আমার দিকে এমন ভঙ্গিতে তাকালেন যার তরজমা করলে দাঁড়ায় ‘ বঙ্গেতে জন্মিয়া জন্ম তব আজন্মই বৃথা গেছে হে বাছা’। এই প্রথম নিজের উপর খুব ঘেন্না হলো। নিজেকে ভর্ৎসনা আর অভিশাপ দিতে দিতে বেরিয়ে এলাম৷ মনে মনে পাক্কা ইরাদা করলাম দেশে ফিরে এবার হযরতপুরের হযরতের দরবারে চিল্লাকশী করবো। হযরতপুরের হযরতকে নিয়ে আমাদের উস্তাদ মুফতি ফয়যুল্লাহ আমানের একটি কবিতা আছে, হযরতের মাহাত্ম্য বুঝতে এই কবিতাটি অবশ্যপাঠ্য। কবিতার শেষ চার লাইন এমন- হে জ্ঞানপিয়াসী তত্ত্ব-প্রিয়রা!/ এই জড় সভ্যতা কবে আর কত মহাকাল পরে/ এই নির্মল আলোকে শুভ্রতায় অবগাহিত হবে? হযরতপুরের হযরতের সান্নিধ্য সুবাসে।
নদওয়ার আঙিনাজুড়ে মেহেগুনির পাতা বিছিয়ে আছে। শুকনো পাতায় মর্মর ধ্বনি তুলে অবিরাম হেঁটে চলেছি। যে পথ মারিয়েছেন মুহাম্মাদ আলী মুঙ্গেরী, শিবলি নোমানী, সুলাইমান নদবী সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদবী। মুহুর্তের জন্য আমি হারিয়ে যাই সে মহিরুহুদের আলোর মিছিলে।
নদওয়ার কেন্টিনে বসে জম্পেস আড্ডা চলছে। পাশের টেবিলে বসেই শিক্ষকরা চা খাচ্ছেন। এই দৃশ্য এখানে খুবই সাধারণ। এরচেয়ে আরও স্বাভাবিক হলো ছাত্র ফোন দিয়ে শিক্ষককে বলে, ‘মাওলানা আপ কাহা হ্যাঁয়? ‘শিক্ষক বলছেন, তেরে সামনেহি হ্যাঁয় বেটা’। আমি মোটেও বানিয়ে বানিয়ে বলছি না, যায়েদ মাযাহেরীর সঙ্গে যেই ছেলেটি আমাকে দেখা করাতে নিয়ে গেলো সেই এমন কাণ্ডই ঘটিয়েছিলো৷ ছেলেটির নাম ইমরান কাজী। যে হলে আমার লাখনৌ সফর অপূর্ণই থেকে যেতো।
উর্দু থেকে পানা চেয়ে শুরুতেই সালমান নদবীর কাছ আরবীতে বলার অনুমতি নিয়ে নিলাম। বাংলাদেশে যে তিনি রীতিমত গোমরাহ খেতাব পেয়ে গেছেন সেই সংবাদ শুনে হেসে ফেললেন। বাঙালি হুজুর জাতীর উপর তাঁকে ভীষণ বিরক্ত দেখা গেলো; আড়াই মিনিট অগ্নিঝরা বক্তব্য দিলেন বাঙালি বাজখাঁই জমহুরের বিরুদ্ধে। তার মতে বাংলাদেশী হুজুরদের অপকর্ম আর ভ্রষ্টাচারের কারণেই আল্লাহ পাক নারী নেতৃত্বের আযাব তাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। ইন্দিরা গান্ধী কী তাহলে ভারতের হুজুরদের জন্য নেয়ামত ছিলেন? এই প্রশ্ন করে তাঁকে রাগাতে মন সায় দিলো না। এরপর তিনি তুরস্ক আর এরদোগান বাদে পুরো পৃথিবীর উপর রাগ ঝারলেন। এই ভারত উপমহাদেশে এরদোগানের বিশেষ দুজন ভক্ত রয়েছেন, একজন বাংলার বাঘ মাওলানা মামুনুল হক আরেকজন হলেন মাওলানা সালমান নদবী।
‘ফামাযা আলাইনা নাহনু মা’শারাল উলামা’? তাহলে আমাদের মত হুজুরদের করণীয় কী? ‘আল জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ’ ভেবেছিলাম অতি জযবার চোটে তিনি এই উত্তরটাই দিবেন কিন্তু তিনি কিছুটা সুর নরম করে বললেন, ‘আলাইনা আন নাতামাসসাকা বিউসওয়াতিস সাহাবাতিল কিরাম’। ছাহাবাদের উসওয়া কি ছিলো তার আবার ব্যাখ্যাও দিলেন। ‘আল ইনাবাহ ইলাল্লাহ’।
সালমান নদবীর আরবী বক্তৃতার বিশেষ ফ্যান ছিলাম আমি। টাকা জমিয়ে সাইবার ক্যাফে যেতাম শুধু তার আরবী বক্তৃতা শুনতে। সা’দ সাহেব ইস্যুতে যখন তিনি উচিত কথা বলা শুরু করলেন বাংলাদেশের জমহুরদের কাছে তিনি হয়ে গেলেন গুমরাহ। কিন্তু তাঁর বক্তব্য আমার কাছে নিরপেক্ষ মনে হয়েছে৷ দারুল উলুম দেওবন্দের ব্যপারে তাঁর মন্তব্যকে আমি ব্যক্তিগত মতামত হিসেবেই নিয়েছি। এ নিয়ে ফেসবুকে দুচারটা লেখাও পোস্ট করেছিলাম।
বাংলাদেশে আসার জন্য যখন তাঁকে দাওয়াত দিলাম তখন হেসে দিয়ে বললেন, ‘ কাইফা তাহফাজুনানী ওয়া আনতুম শিরজিমাহ কালিলাহ’। বাংলাদেশের হুজুরদেরকে তিনি উগ্র মনে করেন? এদেশে এলেই তারা তাঁর হাত পা ভেঙে দিবে ভাবলেন? নাকি আমরা সংখ্যায় কম তা নিয়ে একটু রসিকতা করলেন? বুঝা গেলো না। আমি বললাম ‘আল্লাহু ইয়াহফাযুকুম ইনশাআল্লাহু তাআলা। আল কাওয়াকিবুল আশারা নিয়ে কোন মন্তব্য করলেন না, কেবল উৎসর্গের পাতাটি পড়ে পাশে রেখে দিলেন।
ফেরার সময় চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মুসাফাহ করলেন। আমার মত কম বয়সী চেংড়া ছেলের প্রতি তাঁর মত মহান ব্যক্তিত্বের পক্ষ থেকে এ এক বিরাট মহানুভবতার উদাহরণ।
বেরোবার পর খেয়াল করলাম ইমরান কাজী আমার পাশেই বসা ছিলো। সালমান নদবীর সাথে আধাঘণ্টার আরবীতে বাতচিত হয়েছে এই খবর খুব ঘটা করে সে বাংলাদেশী ছাত্রদের মাঝে রটিয়ে দিয়েছে। এতে বাংলাদেশী ছাত্রদের দিলে আমার প্রতি এক্সট্রা রেসপেক্ট পয়দা হয়ে গেছে। সকালে তো ভূনা খিচুরির সাথে মুরগীর ঝাল ফ্রাই খেয়েছিলাম কিন্তু দুপুরে কি খেয়েছি মনে করতে পারছি না, ফারুক ভাই, মইনুল ভাই রফি ভাই এরা সবাই সাইদের বন্ধু। এদের আন্তরিকতা সারা জীবন মনে রাখার মত। বাজার সদাই রান্নাবান্নার উৎসবে তারা দুটো দিন মহা ব্যস্ত কাটিয়েছে। তাদের সান্নিধ্য পেয়ে আমি খুবই কৃতার্থ হয়েছি। লাখনৌ এসে আমার মনেই হয়নি আমি কোন ভিনদেশী।
বিকেলে বের হলাম গোমতি নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর নবাবদের প্রাচীন ঐতিহ্যের শহর লাখনৌ ঘুরতে।
লেখক : শিক্ষক ও পরিভ্রাজক


