২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৮ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৪ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

ফেদায়ে মিল্লাত ও আমার স্বপ্নপুরুষ

  • আমিনুল ইসলাম কাসেমী

দুই হাজার সালের কথা। ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী (রহ.) ফরিদপুর সফরে আসলেন। ফরিদপুর শহরে যেন সাজ সাজ রব। বৃহত্তর ফরিদপুরের উলামায়ে কেরাম, তলাবা এবং সাধারণ মানুষের মাঝে সাড়া পড়ে গেল। অনেকদিন ধরে গোছগাছ চলছিল আওলাদে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগমনকে কেন্দ্র করে। আনন্দের ঢেউ খেলতে লাগল সবার মাঝে। পুরো শহরটা যেন ব্যতিক্রম মনে হচ্ছিল। মহা মনীষীর আগমন, সাথে দেশ সেরা আলেমগণও থাকবেন। কী যে অনুভুতি সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা লেখার ভাষা নেই।

ফরিদপুরের সিংহপুরুষ মুফতী আব্দুল কাদের (রহ.)। মাদানী সিলসিলার একজন খলিফা। আল্লামা আহমাদ শফি (রহ.) এর খেলাফত-ইজাজত প্রাপ্ত। একারণে ফেদায়ে মিল্লাত তথা আওলাদে রাসুল এর প্রতি প্রেমাসক্তি বেশী ছিল। প্রায় এক মাস আগ থেকে প্রস্তুতি চলছিল ফেদায়ে মিল্লাতকে অভ্যর্থনা জানানোর। বৃহত্তর ফরিদপুরের আলেম-উলামাদের তিনি চিঠি পাঠিয়ে ছিলেন। সকলের উপস্থিতি একান্ত কাম্য ছিল তাঁর। আলেমগণ ব্যাপক সাড়া দিয়েছিলেন। আওলাদে রাসুলের আগমনের একদিন পূর্বেই ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী শামসুল উলুম মাদ্রাসায় জমা হয়েছিল সবাই।

সেবার ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী (রহ.) বেনাপোল দিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করেছিলেন। যশোরে কয়েকটি প্রোগ্রাম সেরে এরপর ফরিদপুরে রওনা। তাঁর সাথে দেশের খ্যাতনামা আলেমগণ সফরসঙ্গী হিসাবে ছিলেন। আবার ঢাকা থেকে কিছু উলামায়ে কেরাম সরাসরি ফরিদপুরে এসে হযরত ফেদায়ে মিল্লাতের প্রোগ্রামে শরীক হয়েছিলেন। এক আনন্দঘন পরিবেশ। একে তো আওলাদে রাসুলের আগমন। আবার সেই সাথে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য আলেমদের উপস্থিতি। এ যেন নুরানী মঞ্জিল বনে গেল ফরিদপুরের শামসুল উলুম মাদ্রাসা।

আওলাদে রাসুলের আগমনের দিন চলে আসল। আমরা তো একদিন আগেই হাজির হয়েছিলাম। হযরতকে ইস্তেকবাল করার জন্য হাজারো উলামায়ে কেরাম তৈরী । ফেদায়ে মিল্লাত আসার সময় হয়ে গেল। এমন সময় শুরু হল তুমুল বৃষ্টি । আমরা রাস্তায় দাঁড়াতে পারলাম না। রুমে গিয়ে বসতে হল। হঠাৎ ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী এর গাড়ী প্রবেশ করল শামসুল উলুম মাদ্রাসায়। সাথে মাত্র একটা/দুটো গাড়ি। বৃষ্টির কারণে গাড়ীর বহর এলোমেলা হয়ে গেছে। সব গাড়ী আসতে পারেনি।

আওলাদে রসুল সরাসরি মুফতী আব্দুল কাদের সাহেবের কামরায় প্রবেশ করলেন। মুফতী সাহেবের কামরাতে উঁচু গদি বিছানো ছিল। তিনি সেখানে বসলেন না। সাধারণ আলেমগণ যেখানে বসে আছেন, সেখানেই বসে গেলেন। মুফতী সাহেব ফেদায়ে মিল্লাতকে হরিণের চামড়ার তৈরি আসনে বসার অনুরোধ জানালেন, সেখানেও তিনি বসলেন না। আওলাদে রাসুলের বিনয়-নম্রতা দেখে সবাই অবাক হলেন। এত বড় এক ব্যক্তিত্ব তিনি সাধারণ আলেম উলামাদের সাথে বসে গেলেন। যেটা সত্যি ফেদায়ে মিল্লাতের তাওয়াজুর বহিঃপ্রকাশ।

বৃষ্টি থেমে গেল। একে একে গাড়ি প্রবেশ করতে লাগল শামসুল উলুম মাদ্রাসায়। কোন গাড়ি আগে কোনটা একটু পরে। যে গাড়ি আসে তাঁরা রুমে গিয়ে ফেদায়ে মিল্লাতের সঙ্গে দেখা করেন। আর তিনি উর্দুতে জিজ্ঞেস করেন, দেরী কেন? সকলেই উর্দুতে উত্তর দেন। দেরী হওয়ার কারণ বর্ণনা করেন। কিন্তু উত্তরটা ফেদায়ে মিল্লাতের মনপুত হয় না। তিনি উর্দু বাক্য সংশোধন করে দেন। এভাবে পাঁচ- ছয়টা গাড়ি প্রবেশ করল এবং প্রতিটি গাড়ির উলামাগণ ফেদায়ে মিল্লাতের সাথে দেখা করতে লাগলেন। তাদের দেরী হওয়ার কারণ দর্শালেন। আর হযরত তাদের উর্দু বাক্যগুলো সংশোধন করে দিতে লাগলেন।

সবশেষে আমার স্বপ্নপুরুষ আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের গাড়ি প্রবেশ করল। তিনিও ফেদায়ে মিল্লাতের সাথে গিয়ে দেখা করলেন। তাঁকেও সেই একই প্রশ্ন। দেরী কেন? আল্লামা মাসঊদ সাহেব সুন্দর ভাবে উত্তর দিলেন। এবার আর হযরতের বাক্য সংশোধন করতে হলো না। আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের উত্তরে ফেদায়ে মিল্লাতের চেহারা আলোকিত হয়ে উঠল। সেদিন উপস্থিত উলামায়ে কেরাম অবাক হয়েছিল। আসলে আল্লামা মাসঊদ সাহেব বেমেছাল ব্যক্তিত্ব। তাঁর সাথে কোন তুলনা হয়না। তিনি যে কত উর্ধের মানুষ। ফেদায়ে মিল্লাতের কাছে বসে সেটা স্বচক্ষে দেখেছিলাম

দিনের বেলাতে শামসুল উলুম মাদ্রাসাতে প্রোগ্রাম সেরে রাতে ফরিদপুর শহরের চৌরঙ্গী মসজিদে আরেক ইসলাহী প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়। সেখানেও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বসে ছিলাম। ফেদায়ে মিল্লাতের হৃদয় ছোঁয়া বয়ান। অন্তরজ্বালা যেন উপশম হলো। হৃদয়ের মাঝে নতুন স্বাদ-তৃপ্তি অনুভব করতে লাগলাম। বহুদিনের জমানো ব্যাথা-বেদনা যেন দূর হলো। এর আগেও বহুবার হযরতের আলোচনা শুনেছি। তবে সেগুলো ছিল ছাত্রজীবনে। কর্মজীবনে এসে হযরতের এত কাছে বসার সুযোগ হয়নি। কর্মজীবনে এসে এই প্রথম প্রাণভরে হযরতের বয়ানগুলো শুনলাম। যাতে ভক্তি-শ্রদ্ধার পাহাড় জন্মে গেল হযরতের প্রতি।

রাতে ফরিদপুরে ইকরা বাংলাদেশ স্কুলের শাখা উদ্বোধন হলো। রাত যাপন ইকরাতে। তবে হযরতের সাথে একান্ত সাক্ষাতে কেউ যেতে সাহস করছেন না। দীর্ঘ সফরে হযরত ছিলেন ক্লান্ত। তবে মজার দৃশ্য দেখলাম। ফেদায়ে মিল্লাতের সাথে একান্ত সাক্ষাতে মিলিত হয়েছেন আমার স্বপ্নপুরুষ আল্লামা মাসঊদ সাহেব। যেখানে দেশের শত শত খ্যাতিমান আলেম। কেউ তাঁর খাছ কামরাতে যার সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু প্রিয় শায়েখ আওলাদে রাসুলের সাথে বিশেষ সাক্ষাতে মিলিত হয়েছেন। সে দৃশ্য দেখে অন্তরটা জুড়িয়ে গেল। কী প্রেম-ভালোবাসা ছিল ফেদায়ে মিল্লাতের সাথে। খাছ কামরাতে ডেকে নিয়ে বিশেষ আলোচনায় মিলিত হয়েছেন। আজও চোখের পাতায় ভাসতে থাকে সে মনোরম দৃশ্য।

রাতে সিদ্ধান্ত হলো, ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী সাহেব সকাল বেলা দৌলতদিয়া ঘাট লঞ্চে পার হয়ে ঢাকাতে যাবেন। এজন্য লঞ্চ ভাড়া করে রাখতে হবে আগে থেকে। দায়িত্ব দেওয়া হলো আমাকে এবং দৌলতদিয়া ঘাটের মুফতী আব্দুল কাদের (যিনি বর্তমানে ঢাকাতে কর্মরত )। বড় সৌভাগ্যবান আমি। ফেদায়ে মিল্লাতের জন্য সামান্য এই খেদমত যেন লুফে নিলাম। রাতেই ফরিদপুর থেকে ফিরে গোয়ালন্দ ঘাটে চলে আসলাম এবং লঞ্চ ভাড়া করে রাখলাম। সকাল ৭ টার দিকে ফেদায়ে মিল্লাত চলে আসলেন দৌলতদিয়া ঘাটে। আমাদের ভাড়া করা লঞ্চে ওঠে বসলেন।

একটা স্মরনীয় দিন আমার। আবার জীবনের সেরা এক মুহুর্ত। প্রতিটি মানুষের জীবনে সেরা একটা মুহুর্ত থাকে। আমার জীবনের সেরা একটা মুহুর্ত ছিল। বিশাল এক লঞ্চে ফেদায়ে মিল্লাত এবং আমরা তাঁর সফর সঙ্গী হিসাবে ১০/১২ জন। পুরো লঞ্চ ফাঁকা। দোতলায় সাধারণ সিটে বসে আছেন আরব-আজমের শায়েখ, তৎকালিন বিশ্বের ইসলামী রেঁনেসার অগ্রদূত আওলাদে রাসুল সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী (রহ.)। তাঁর পাশেই বসা ছিলেন আমার স্বপ্নপুরুষ, দারুল উলুম দেওবন্দের সূর্যসন্তান আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব দামাতবারাকাতুহুম। আর ঠিক তাঁদের বরাবর সোজা সামনের বেঞ্চে বসেছিলাম আমি। কী অভুতপুর্ব দৃশ্য। কী যে স্মরনীয় এক মুহুর্ত। সেটা বলে বোঝানো যাবেনা।

আপাদামস্তক নুরানী শোভায় সুশোভিত। মাথায় বাঁধা সেই রুমাল। স্বেতশ্রুভ্র বসন। আর লালটকটকে চোহারাতে যেন এক মহামানবের আসল রুপ ফুটে ওঠেছিল। মনে হচ্ছিল এ তো এ জগতের কেউ নয়। কোন উর্ধ জগতের কোন পবিত্র আত্মা বসা আছে। জোর্তিময় পুরুষ। চারিপাশ যেন আলোকিত হয়ে উঠছে। শুধু অপলক তাকিয়ে ছিলাম। আর তাঁর পাশেই বসা তাঁরই খলিফা, তাঁর বিশেষ দোয়া ও ইজাজতে ধন্য। যেমন তিনি ইলমে এবং আমলে অনেক উচ্চ মাকাম হাসিল করেছেন। আবার ফেদায়ে মিল্লাতের বিশেষ নেক নজরে তিনিও যেন উর্ধ জগতের কোন বিশেষ কিছু লাভ করেছেন।

পদ্মার ঢেউ আস্তে আস্তে শুরু হলো। লঞ্চ দুলছে। কিন্তু কী যে এক প্রেমসুধা আমাকে আন্দোলিত করছে। আমি নির্বাক হয়ে বসে আছি। প্রিয় মানুষের কাছে গেলে তো মানুষ সব ভুলে যায়। প্রেমাস্পাদের কাছে বসলে সকল ব্যাথা-বেদনার অবসান ঘটে। কোন সুওয়াল আর থাকে না। ইতোপুর্বে যদি কোন প্রশ্ন জমা থাকে, তবে প্রিয়জনকে কাছে পেলে আর কোন প্রশ্ন বাকি থাকেন না। সব ‘হল’ হয়ে যায়। যেমন মাওলানা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী (রহ.) যখন শায়খুল হিন্দ এর খেদমতে গিয়ে বসতেন। অনেক প্রশ্ন নিয়ে যেতেন। তিনি শায়েখের কাছে সেগুলো হল করে নিবেন। কিন্তু শায়েখের মজলিসে বসার পরে সব প্রশ্নের সমাধান হয়ে যেত।

মজলিস শেষে শায়খুল হিন্দ শাহ সাহেবকে বলতেন, আপনার কোন প্রশ্ন আছে কিনা। শাহ সাহেব বলতেন, যে প্রশ্ন নিয়ে এসেছিলাম, সব মজলিসে বসার পরে সব সমাধান হয়ে গেছে। এটাছিল ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ। গুরু ভক্তির এক উজ্জল দৃষ্টান্ত। ঠিক সেই লঞ্চ সফরে শায়েখদের সামনে বসে যে এক অনুভূতি হয়েছিল। সেটা সীমাহীন। অন্তরের ব্যাথা-বেদনা যেন দুরীভূত হলো। নতুন কিছু প্রবেশ করল। আল্লাহর খাছ বান্দার সামান্য সোহবতে যেন অন্তর খুলে গেল। জেহেন পাক-সাফ হয়ে খাঁটি প্রেমশক্তি জমা হলো।

লঞ্চ পার হয়ে এবার ছুটলাম ফেদায়ে মিল্লাতের গাড়ির পিছনে পিছনে। খুলনার মাওলানা ইমদাদুল্লাহ কাসেমী বলেছিলেন, মাওলানা! একদিন গর্ব করবেন, ফেদায়ে মিল্লাতের গাড়ির পিছনে পিছনে ছুটে চলার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেই সাথে আমার স্বপ্নপুরুষ এর পিছনে পিছনে। বড় আনন্দঘন পরিবেশ। এক ইতিহাস। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে। ফেদায়ে মিল্লাত নেই। মহান আল্লার সান্নিধ্যে আছেন। তবে আমার শায়েখ আছেন। আল্লাহ তাঁর নেক হায়াত দান করেন। অনেক কাছে থেকে ফেদায়ে মিল্লাত এবং প্রিয় ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের সেই ভালোবাসার দৃশ্য দেখে চোখ জুড়ায়েছি। অন্তরের জ্বালা উপশম হয়েছে। সেই স্মৃতি কোনদিন ভোলার নয়।

পরিশেষে ফেদায়ে মিল্লাতকে আল্লাহ তায়ালা জান্নাতুল ফিরদাউস দান করেন। এবং আল্লাহ তায়ালার নিকট আমার শায়েখের নেক হায়াত কামনা করি। আল্লাহুম্মা আমিন।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

আরও পড়ুন: আমার স্বপ্নপুরুষ যিনি, আমি তাঁর গল্প বলি

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com